সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেপথ্যে থেকে যে মুখটি এতদিন সাধারণ মানুষের কাছে ভিন্নরূপে পরিচিত ছিল, তার আড়ালেই কি লুকিয়ে ছিল অন্য এক ভয়ঙ্কর রূপ? পটুয়াখালীর খেপুপাড়া সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৫ লাখ টাকার ক্ষতিসাধন, জমি দখল এবং শিক্ষকদের ওপর হামলার চাঞ্চল্যকর অভিযোগে এবার আদালতের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন বিতর্কিত কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও জাতীয়তাবাদী ছাত্র পরিষদ (এনসিপি) নেতা নুরুজ্জামান কাফি।
অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক পরিচয়ের তকমা ও সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে কাফি ও তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় অবৈধ জমি দখল, বেপরোয়া চাঁদাবাজি এবং নিরীহ মানুষকে জিম্মি করে ‘মামলা বাণিজ্য’ চালিয়ে আসছে। ক্ষমতার দাপটে বেপরোয়া হয়ে ওঠা কাফি এবার হাত বাড়িয়েছেন একটি ঐতিহ্যবাহী সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খাসজমিতে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ১১ জুলাই সকালে কাফি, তার বাবা এবিএম হাবিবুর রহমান এবং বড় ভাই মামুন সংঘবদ্ধ হয়ে মাটি কাটার ভেকু মেশিন, ভ্যান ও ইটের খোয়া নিয়ে খেপুপাড়া সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মালিকানাধীন রজপাড়া মৌজার জমিতে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে।
বিদ্যালয়ের জমিতে অবৈধ চলাচলের রাস্তা তৈরির জন্য ভেকু দিয়ে মাটি কাটা শুরু করলে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহিম চার-পাঁচজন সহকারী শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং বাধা দেন।
শিক্ষকদের বাধা দেওয়া মাত্রই কাফি চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং শিক্ষক আব্দুর রহিমের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় উপস্থিত শিক্ষকদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার, ধাক্কাধাক্কি এবং প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেয় কাফি ও তার সঙ্গীরা।
এরপর কাফি ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে বিদ্যালয়ের ১১০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩০ ফুট প্রস্থের প্রায় ৬ শতাংশ জমির ১ লাখ টাকার মাটি কেটে নিয়ে নিজের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করে রাখে। শুধু তাই নয়, জমিতে পাথর ফেলে রাস্তা বানিয়ে বিদ্যালয়ের প্রায় ৫ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতিসাধন করে।
ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে আপস-মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও কাফির দাপটের কাছে তা ব্যর্থ হয়। প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহিম জানান:
“আমরা প্রতিকার চেয়ে প্রথমে কলাপাড়া থানায় যাই। কিন্তু থানা কর্তৃপক্ষ আমাদের বিজ্ঞ আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেয়। বিদ্যালয়ের সরকারি সম্পদ রক্ষা এবং কাফির মতো প্রভাবশালী দখলদারদের হাত থেকে প্রতিষ্ঠানকে বাঁচাতে আমরা বাধ্য হয়ে আদালতের দ্বারে গিয়েছি।”
রোববার (২১ জুলাই) কলাপাড়ার বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ বিষয়ে মামলা করা হয়। বিজ্ঞ আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলামকে বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পরিচিতি এবং এনসিপির দলীয় প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কাফি পুরো কলাপাড়া এলাকায় এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। নিরীহ মানুষের জমি দখল করা, ভয়ভীতি দেখিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় এবং কথা না শুনলে কাল্পনিক অভিযোগে মামলা বাণিজ্যের মাধ্যমে মানুষকে হয়রানি করা তার নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
যদিও নুরুজ্জামান কাফি বরাবরের মতোই নিজের অপরাধ ঢাকতে ঘটনাটিকে ‘ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছে, তবে খেপুপাড়া সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের শান্তিপূর্ণ ভোগদখলে থাকা জমিতে হামলা ও শিক্ষকদের ওপর চড়াও হওয়ার ঘটনা কাফির সেই মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছে।
শিক্ষকসমাজ ও সর্বস্তরের এলাকাবাসীর এখন একটাই দাবি—আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং তদন্তের মাধ্যমে এই প্রভাবশালী দখলদার কাফির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

