নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৪ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করার কথা বলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) কার্ডিয়াক সেন্টারের একটি সিসিইউ বেড দীর্ঘ ১৮ মাস সংরক্ষিত রাখার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। এসংক্রান্ত একটি অফিস আদেশের কপি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সীমিত সিসিইউ সুবিধা সাধারণ রোগীদের চোখের আড়ালে দীর্ঘ সময় আটকে রাখার প্রশাসনিক যৌক্তিকতা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকাশিত নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর বিএসএমএমইউর কার্ডিওলজি বিভাগের একটি অফিস আদেশে জানানো হয়—১৬ অক্টোবরের আরেকটি আদেশের প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সিসিইউ-২-এর ১ নম্বর বেডটি বিশেষভাবে সংরক্ষিত রাখা হলো।
একই সঙ্গে ওই বেডের ভিআইপি চিকিৎসাসংক্রান্ত সার্বক্ষণিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষ মেডিকেল বোর্ডও গঠন করা হয়েছিল। উক্ত কমিটিতে কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আবু সেলিমকে সভাপতি এবং ডা. খন্দকার কামরুজ্জামান, ডা. দীনে মুজাহীদ মো. ফারুক ওসমানী, ডা. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল জামালী ও সিসিইউ-২-এর ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স রিপা রানী দেবকে সদস্য করা হয়। কার্ডোলজি বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদ এই নথিতে অনুমোদনকারী কর্মকর্তা হিসেবে স্বাক্ষর করেছিলেন।
বিশেষায়িত এই চিকিৎসালয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত জটিল রোগীদের জন্য সিসিইউ বা আইসিইউ বেড পাওয়া প্রায়শই জীবন-মরণের লড়াই হয়ে দাঁড়ায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি সিসিইউ কেবিন যদি নিয়মিত রোগীদের জন্য উন্মুক্ত থাকত এবং গড়ে প্রতি রোগী এক সপ্তাহ করে সেখানে সেবা পেতেন, তবে এই দীর্ঘ ১৮ মাসে অন্তত ৭৮ জন গুরুতর অসুস্থ রোগী ওই বেডটিতে জীবনরক্ষাকারী সেবা পাওয়ার সুযোগ পেতেন।
স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি হাসপাতালের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বেড এভাবে দীর্ঘ সময় নির্দিষ্ট একজনের নামে অলস বা সংরক্ষিত রাখার ফলে সাধারণ রোগীসেবা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। পাশাপাশি, এটি প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক রাজস্ব ও সেবামূলক কার্যক্রমকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্বাস্থ্য মহলে বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তৎকালীন বিএসএমএমইউ প্রশাসনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্ত দাবি করেছেন।
তদন্তের মাধ্যমে যেসব বিষয় উন্মোচন করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা:
- ১৮ মাসের এই দীর্ঘ সময়ে বেডটি প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ খালি ছিল কি না, নাকি অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।
- জরুরি চিকিৎসাপ্রার্থী কোনো মুমূর্ষু রোগী বেড না পেয়ে ফেরত বা অন্যত্র প্রেরিত হয়েছিলেন কি না।
- ড. ইউনূসের চিকিৎসায় আদৌ এই বেডটি কখনো ব্যবহার করা হয়েছিল কি না এবং হয়ে থাকলে তার মেয়াদ কতদিন ছিল।
একটি লিখিত প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বিশেষায়িত হাসপাতালে দীর্ঘমেয়াদে এমন ভিআইপি সুবিধা সংরক্ষণের ঘটনা জনমনে গভীর আক্ষেপ ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

