নিজস্ব প্রতিনিধি :
দেশের চিকিৎসা সেবার সর্বোচ্চ ভরসাস্থল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও শিউরে ওঠার মতো। একদিকে হাসপাতালের মর্গে হিমাগার বিকল হয়ে ২০টি মরদেহ পচে পোকা ধরার মতো চরম অমানবিক ঘটনা ঘটেছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর তীব্র সংকটে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন আজ ওষ্ঠাগত।
দেশের সবচেয়ে বড় ও স্পর্শকাতর একটি হাসপাতালের এই দশা বর্তমান সরকারের চরম অব্যবস্থাপনা, দূরদর্শিতার অভাব এবং স্বাস্থ্য খাতের প্রতি সীমাহীন অবহেলাকেই নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলছে।
একটি সভ্য সমাজে হাসপাতালের মর্গে মরদেহ পচে যাওয়ার ঘটনা কেবল দুঃখজনকই নয়, বরং চরম লজ্জাজনক। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ঢামেক মর্গের ৪০টি মরদেহ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন হিমাগারটি বিকল হয়ে পড়ে ছিল। কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতায় সেখানে রাখা অজ্ঞাতনামা নবজাতকসহ প্রায় ২০টি মরদেহ পচে, পোকা ধরে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে উপায় না দেখে ১৫টি মরদেহ তড়িঘড়ি করে দাফনের জন্য আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এখনো পচে যাওয়া বেশ কিছু মরদেহ হিমঘরে রাখা হয়েছে।
দেশের প্রধান একটি হাসপাতালের মর্গ রক্ষণাবেক্ষণের এই নজিরবিহীন অবহেলা প্রমাণ করে, স্বাস্থ্য প্রশাসনের জবাবদিহিতা আজ কতটা ভেঙে পড়েছে।
প্রতিদিন ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে প্রায় ১,৫০০ রোগী সেবা নেন, যার মধ্যে ৩৫০ জনেরও বেশি থাকেন গুরুতর ও রক্তাক্ত জখম হওয়া রোগী। অথচ, এই বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য ন্যূনতম সামগ্রীটুকু দিতে পারছে না হাসপাতাল প্রশাসন।
গজ, ব্যান্ডেজ, প্লাস্টার ব্যান্ডেজ, ক্ষতস্থানে সেলাইয়ের সুতা থেকে শুরু করে সাধারণ অ্যান্টিসেপটিক তরল—সবকিছুই রোগীদের নিজেদের টাকা দিয়ে বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে যে দরিদ্র মানুষগুলো শেষ সম্বলটুকু নিয়ে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার আশায় আসেন, ওষুধের দোকানে দৌড়াদৌড়ি করতেই তাদের পকেট খালি হয়ে যাচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, “অর্থবছরের শেষ দিকে” সাময়িক এই সংকট তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে: পূর্বপরিকল্পনার অভাব কেন? সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা হাসপাতাল প্রশাসন কি জানত না যে জুন মাসে অর্থবছর শেষ হয়? তাহলে কেন আগে থেকে জীবনরক্ষাকারী সামগ্রীর পর্যাপ্ত বাফার স্টক (মজুদ) রাখা হলো না?
২৬০০ শয্যার হাসপাতালে নিয়মিত ৩,৫০০-এর বেশি রোগী ভর্তি থাকে। এই অতিরিক্ত চাপের কথা জেনেশূর্তেও কেন বাজেট ও লজিস্টিকস আগের থেকে বাড়ানো হয়নি?
প্রতি বছর স্বাস্থ্য খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হলেও, তৃণমূল পর্যায়ে তার সুফল পৌঁছাচ্ছে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সময়মতো কেনাকাটা (procurement) না করা এবং তদারকির অভাবে সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় চলা দেশের সবচেয়ে বড় হাসপাতালটি আজ স্বয়ং নিজেই ‘আইসিইউ’-তে চলে গেছে।

