নিজস্ব প্রতিবেদক | Info Bangla
রাজধানী ঢাকাতেই প্রতিদিন অন্তত পাঁচ থেকে ছয়বার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনা এখন আর স্রেফ সাময়িক ভোগান্তি নয়, বরং এক তীব্র নগর সংকটের রূপ নিয়েছে। তবে এই চেনা অন্ধকারই নাগরিক মনে তুলে দিচ্ছে এক গভীর ও আশঙ্কাজনক প্রশ্ন—দেশের মূল প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র ঢাকার যদি এই দশা হয়, তবে মফস্বল কিংবা প্রান্তিক বাংলাদেশের অবস্থা কতটা ভয়াবহ? ঢাকা শহর যেখানে দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার শীর্ষ অগ্রাধিকারে থাকে এবং এখানকার পাওয়ার গ্রিডকে সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুরক্ষিত রাখার কথা, সেখানে দিনে বারবার লোডশেডিং স্পষ্ট করে দেয় যে সার্বিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা এখন কতটা নাজুক সুতোয় ঝুলছে।
ঢাকার বুকে ঘনঘন এই বিদ্যুতের আশাজাওয়ায় থমকে যাচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। তীব্র গরমের মাঝে বাসা-বাড়িতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় যেমন সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, তেমনি তথ্যপ্রযুক্তি খাত, ছোট-বড় শিল্পকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটার পাশাপাশি হাসপাতাল ও জরুরি সেবা কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখতে জেনারেটরের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভর করতে হচ্ছে, যা দিনশেষে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তবে ঢাকার এই সংকটের ভয়াবহতা শতগুণ বড় হয়ে ফুটে ওঠে যখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর দিকে চোখ রাখা যায়। দেশের পাওয়ার গ্রিডের অগ্রাধিকার তালিকায় ঢাকার অবস্থান সব সময় শীর্ষে। ফলে রাজধানীতে যখন পাঁচ-ছয়বার বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে, তখন মফস্বল ও গ্রামগুলোতে যে টানা ১০ থেকে ১২ ঘণ্টাও বিদ্যুতের দেখা মেলে না, তা অনুমান করতে কোনো বিশেষ হিসাবের প্রয়োজন পড়ে না। গ্রামীণ অর্থনীতি, যা মূলত কৃষি ও ক্ষুদ্র কুটির শিল্পভিত্তিক, এই নিরবচ্ছিন্ন লোডশেডিংয়ের কারণে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। সেচপাম্প চালানো থেকে শুরু করে প্রান্তিক বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্য—সবখানেই থমকে গেছে চাকা।
বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির বহু পরিসংখ্যান সামনে এলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। কেবল উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করলেই যে সংকট মেটে না, বরং সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন না হলে দেশের সাধারণ মানুষ তার সুফল পায় না, ঢাকার বর্তমান চিত্র তারই জলজ্যান্ত প্রমাণ। আশ্বাসের বাণীতে আর সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ লাঘব হচ্ছে না। এই চলমান সংকট নিরসনে কেবল সাময়িক তালি দেওয়া সমাধান নয়, বরং দেশের সার্বিক জ্বালানি নীতি পুনর্মূল্যায়ন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং মফস্বল ও রাজধানীর মধ্যে বিদ্যুৎ বন্টনের বৈষম্য দূর করতে দ্রুত ও টেকসই কাঠামোগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

