কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: কুড়িগ্রামে ধর্মীয় বিশ্বাস ও সুদমুক্ত শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের বিশ্বাসযোগ্যতাকে পুঁজি করে প্রায় ১৫০ জন সাধারণ মানুষের ১২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কতিপয় দায়িত্বশীল নেতার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের দায়ের করা অভিযোগ ও আয়োজিত মানববন্ধন থেকে উঠে এসেছে এক সংগঠিত আর্থিক প্রতারণার চিত্র।
প্রতারণার কৌশল ও ‘ভিশন এন্টারপ্রাইজ’ প্রতিষ্ঠা
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালে জামায়াতে ইসলামীর কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সহকারী সেক্রেটারি শাহজালাল সবুজ, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য রফিকুল ইসলাম, রোকন আবদুস সালাম এবং শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় বায়তুল মাল সদস্য রফিকুল ইসলাম যৌথভাবে ‘ভিশন এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
সুদমুক্ত ও শরিয়াহভিত্তিক হালাল ব্যবসার নিশ্চয়তা দিয়ে স্থানীয়দের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ শুরু করেন তারা। প্রাথমিক চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি লাখ টাকার বিনিয়োগে মাসে ১ হাজার টাকা হারে লভ্যাংশ পরিশোধ করা হতো। প্রায় সাড়ে চার বছর স্বাভাবিক লেনদেন বজায় রেখে গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করা হলেও ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে হঠাৎ করেই মুনাফা দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এর ঠিক এক মাসের মাথায়, অর্থাৎ ১৬ নভেম্বর ২০২৪, তারা প্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলিয়ে আত্মগোপনে চলে যান এবং আমানতকারীদের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
সর্বস্বান্ত আমানতকারীদের আকুতি
বিনিয়োগের নামে সর্বস্বান্ত হওয়া ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ:
স্কুল-শিক্ষক মোহফুজুল হক বলেন, ২০২২ সালে বিভিন্ন লাভজনক কোম্পানির ডিলারশিপের লোভনীয় প্রস্তাব পেয়ে সাড়ে ৯ লাখ টাকা জমা দেন। ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত লভ্যাংশ পেলেও বর্তমানে মূলধন ও লভ্যাংশ হারিয়ে দিশেহারা।
গৃহিণী মোছলেমা বেগম বলেন, অবসরকালীন সঞ্চয় ও এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের ১০ লাখ টাকা তুলে দেন জামায়াত নেতাদের হাতে। বিগত দুই বছর ধরে তিনি মুনাফা বা আসল টাকার কোনো হদিস পাচ্ছেন না।
পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি ও পরিচালনা পর্ষদ
প্রতারণার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই পরিচালকদের মধ্যে শুরু হয়েছে পারস্পরিক দায় চাপানোর খেলা:
• শাহজালাল সবুজের দাবি: তিনি এ আর্থিক প্রতারণায় জড়িত নন। তার মতে, ‘ভিশন এন্টারপ্রাইজ’ মূলত রফিকুল ইসলামের একক ব্যবসা এবং তাকে রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে হেয় করতেই এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
• রফিকুল ইসলামের বক্তব্য: শাহজালাল সবুজের বক্তব্য খণ্ডন করে তিনি জানান, চারজন মূল অংশীদারের আনুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমেই ব্যবসার সূচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে আরও দুইজন যুক্ত হয়ে মোট ৬ জন পরিচালক সমানভাবে সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেছেন। ফলে দায়ও সবার।
দলীয় তদন্ত ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা
ঘটনাটি জেলা জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের গোচরে আনা হলে বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়। কুড়িগ্রাম জেলা জামায়াতের আমির আজিজুর রহমান জানান, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মূল অভিযুক্ত রফিকুল ইসলামকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। অন্যদিকে শাহজালাল সবুজের রোকন পদ দুই মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। অন্য দুই পরিচালকের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা তদন্তে পাওয়া যায়নি। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা তাদের পাওনা টাকা আদায়ে আইনি পথ অবলম্বন করলে দল তাদের পাশে থাকবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

