নিজস্ব প্রতিবেদক: ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর থেকেই বিএনপি সরকারের চরম অদূরদর্শিতা, ব্যর্থতা এবং দুর্নীতিপরায়ণ নীতির কারণে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে উপনীত হয়েছে। আক্ষরিক ও ভাবগত—উভয় অর্থেই দেশ আজ গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। লেখাটি প্রস্তুত করার সময় দেশজুড়ে ৩৭০০ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের এক নতুন ও লজ্জাজনক রেকর্ড তৈরি হয়েছে। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, বিদ্যুৎ বিভাগের দৈনন্দিন কার্যক্রমে এই রেকর্ড যেন প্রতিদিনের নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
তবে এই বিপর্যয় এখানেই শেষ নয়; বরং সামনে আরও ভয়াবহ ও অন্ধকার দিন অপেক্ষা করছে। জ্বালানির চরম সংকটের কারণে ইতোমধ্যেই দেশের ৪৯টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, এবং বন্ধের এই তালিকা প্রতিদিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এক সাক্ষাৎকারে দেশবাসীর সামনে এক সরল অথচ আতঙ্কজনক স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত অর্থের যোগান সরকারের হাতে নেই। তাছাড়া, পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো সচল রাখার মতো যথেষ্ট জ্বালানিও মজুদ নেই। ফলে খুব শীঘ্রই দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও মারাত্মক রূপ ধারণ করবে।
প্রশ্ন হলো, অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল এই মন্ত্রণালয়ে এমন ব্যক্তিদের কেন বসানো হলো, যাঁদের অদক্ষতা অতীতেও প্রমাণিত? বিশ্লেষকদের মতে, দেশ ও জনগণের কল্যাণের চেয়ে দলীয় ফান্ডে নিয়মিত কমিশন জমা দেওয়াই এই সরকারের একমাত্র লক্ষ্য। জ্বালানি তেল ও এলপিজি গ্যাস আমদানির মতো লাভজনক খাতগুলো এখন একচেটিয়েভাবে নির্দিষ্ট কিছু সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়ার চূড়ান্ত আয়োজন চলছে। বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার এই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ একটি নির্দিষ্ট মহলের হাতে তুলে দেওয়ার পেছনে মোটা অঙ্কের কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। যে মহলের কর্ণধারদের বিরুদ্ধে অতীতেও রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ ছিল, তাদের ওপরই পুনরায় দেশের জ্বালানি খাতের একক দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।
বিএনপি যখনই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে, তখনই তারা দেশের সফল অগ্রযাত্রাকে থমকে দিয়ে দেশকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন তারা একটি অত্যন্ত নাজুক ও ভঙ্গুর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পেয়েছিল। কিন্তু মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় তারা সেটিকে একটি মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়। সে সময় জাতীয় গ্রিডে ১৬০৫ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ যুক্ত করা হয়েছিল এবং আরও প্রায় ৪০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রেখে যাওয়া হয়েছিল।
২০০১ সালের অক্টোবর মাসে যখন বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখনো তৎকালীন সরকারের নেওয়া ২২৫ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প বাস্তবায়নের ঠিক শেষ পর্যায়ে ছিল। এমনকি তৎকালীন দৈনিক প্রথম আলোর (১৭ অক্টোবর ২০০১) একটি প্রতিবেদনেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া এই সুপরিকল্পিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করলেই আগামী গ্রীষ্মের চাহিদা অনায়াসেই মেটানো সম্ভব হতো এবং নতুন সরকারকে কোনো বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হতে হতো না।
কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে প্রতিহিংসার বশে সেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাগুলো সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়। যার ফলশ্রুতিতে দেশ এক ভয়ংকর বিদ্যুৎ সংকটের মুখে পড়ে।
পরিকল্পনার অভাব এবং চরম অব্যবস্থাপনার কারণে ২০০৫ সালের মধ্যেই দেশের বিদ্যুৎ খাত এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে পতিত হয়। সে সময়কার দৈনিক প্রথম আলোর (১১ জুন ২০০৫) প্রতিবেদন অনুযায়ী, “বিদ্যুৎ খাতে শুধুই বিশৃঙ্খলা/ সংস্কারও একরকম স্থবির।” বিদ্যুতের চরম অনুপস্থিতির কারণে শিল্প কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে জাতীয় জিডিপির ওপর (প্রায় ২ শতাংশ ক্ষতি)।
পরিস্থিতি এতটাই লাগামছাড়া হয়েছিল যে, ২০০৬ সালের এপ্রিল মাসে বিদ্যুতের দাবিতে ক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ মানুষের ওপর তৎকালীন পুলিশ প্রশাসনের নির্বিচার গুলিতে শিশুসহ ১৩ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। রক্তে ভেজা সেই কানসাটের শোকাবহ ইতিহাস আজও এ দেশের মানুষের মনে ক্ষতের সৃষ্টি করে।
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, বিএনপি সরকার মানেই সাধারণ মানুষের জীবনে লোডশেডিংয়ের অভিশাপ আর অন্ধকার। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরও বিগত দিনের মতো একই অন্ধকারের ছায়া নেমে এসেছে পুরো দেশে। কমিশনের ধান্দায় ব্যস্ত এই অযোগ্য সরকারের খামখেয়ালিপনার কারণে আজ পুরো জাতি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এই নজিরবিহীন বিপর্যয় রোধে অবিলম্বে কমিশননির্ভর সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে, সমগ্র দেশ আবারও আরেকটা ‘কানসাট’ দেখার আশঙ্কায় প্রমাদ গুনছে। দেশের মানুষ আর অন্ধকার দেখতে চায় না; তারা চায় এই অদক্ষ সরকারের কবল থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পূর্ণ মুক্তি।
