নিজস্ব প্রতিবেদক | Info Bangla
ময়মনসিংহের ‘জুলাই যোদ্ধা’ দাবি করা আল আমিনের হাত কাটা একটি ছবি সম্প্রতি নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেয়ার পর তার ছবি ও বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতনের পর বিজয় মিছিল শেষে বাড়ি ফেরার পথে আহত হওয়ার দাবি করলেও আন্দোলনের নেতা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। একই সাথে প্রশ্ন উঠেছে সরকারিভাবে তার ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে গেজেটভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও।
আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া স্থানীয় অন্তত তিনজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যমতে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাত আনুমানিক ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়নের কলপা গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। আল আমিন তার কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে মিলে সেই গ্রামে হামলা চালাতে গিয়েছিলেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘটনাস্থল কলপা এলাকা (২৯ নং ওয়ার্ড) আল আমিনের বাড়ি সানকিপাড়া শেষ মোড় (৪ নাম্বার ওয়ার্ড) থেকে ২ কিলোমিটারের বেশি দূরে অবস্থিত। ময়মনসিংহ শহরে যাওয়ার পথে ২৯ নং ওয়ার্ডের মানুষকে ৪ নং ওয়ার্ডের ওপর দিয়েই যেতে হয়। অর্থাৎ আল আমিনের বাড়ি থেকে আরও কয়েক কিলোমিটার দূরের গ্রামে ঘটনাটি ঘটেছিল, যা তার স্বাভাবিক বাড়ি ফেরার পথ নয়। ফলে বিজয় মিছিল শেষে বাড়ি ফেরার পথে হামলার শিকার হওয়ার দাবিটি অসত্য প্রমাণিত হয়।

হামলার ঘটনায় ১৬ অক্টোবর, ২০২৪ সালে মো আল আমিনের মামলার এজাহার। ছবি : সংগৃহীত
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সুলতান মোহাম্মদ রোহান জানান, বিজয় মিছিল শেষ করে ৫-৬টি মোটরসাইকেলে স্থানীয় যুবদল নেতা আসাদুজ্জামান নবীন ও আল আমিনসহ ৮-১০ জন মিলে কলপা গ্রামে হামলা চালাতে যান। যুবদল নেতা নবীন এবং ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের ২৯নং ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার (সদর উপজেলা যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক) রাশেদুজ্জামান রোমানের ভাইয়ের মধ্যে ব্যবসায়িক শত্রুতা ছিল। সেই সূত্র ধরেই বিজয় মিছিলের সুযোগে তারা সেখানে হামলা ও ভাঙচুর করতে গিয়েছিলেন। সাবেক ছাত্রদল নেতা আসাদুজ্জামান নবীন ওই এলাকায় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের কথা স্বীকার করলেও সরাসরি ডাকাতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভয়ের কারণে তারা ওই এলাকায় আগে যেতে পারেননি এবং দলীয় প্রভাব বিস্তারের জায়গা থেকেই সেখানকার পরিস্থিতি এমন রূপ নিয়েছিল।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং আন্দোলনের অন্যতম নেতা আকাশ (ছদ্মনাম) নিরাপত্তার স্বার্থে নাম গোপন রাখার শর্তে জানান, আওয়ামী লীগের ২৯ নং ওয়ার্ড কমিশনারের কার্যালয়ের সামনে হামলা ও ভাঙচুরের একপর্যায়ে গ্রামবাসী তাদের ধাওয়া করে। খবর পেয়ে সানকিপাড়া থেকে ৮০-১০০ জনের একটি দল তাদের উদ্ধার করতে গেলে গ্রামবাসী মসজিদে মাইকিং করে ‘ডাকাত পড়েছে’ বলে ঘোষণা দেয়। মুহূর্তে নারী-শিশুসহ গ্রামবাসী চারদিক থেকে তাদের ঘিরে ফেলে। বৃষ্টিভেজা পিচ্ছিল রাস্তায় পালানোর সময় আল আমিন একটি নির্মাণাধীন ড্রেনে পা পিছলে পড়ে যান। আকস্মিক সেই পরিস্থিতিতে তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি এবং গ্রামবাসী এলোপাতাড়ি কুপিয়ে তাকে গুরুতর আহত করে। তবে একাধিকবার চেষ্টার পরও সাবেক কমিশনার রাশেদুজ্জামান রোমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, হাসপাতালের চিকিৎসা ও তদন্ত প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে আল আমিন জানান, দীর্ঘ দুই মাস হাসপাতালে চিকিৎসার পর সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তদন্তের ভিত্তিতেই তিনি সরকারি ভিআইপি সুবিধায় বিনামূল্যে চিকিৎসা পান। ভিন্ন ঘটনায় আহত হলেও রাজনৈতিক হামলায় আহতদের গেজেটভুক্ত করার নিয়ম আছে বলে তিনি দাবি করেন। কিন্তু বাস্তব চিত্রে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, কেবল তৎকালীন সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা ক্ষমতাসীন দলের হামলায় সরাসরি আহতদেরই ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে গণ্য করা হবে। ময়মনসিংহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক গকুল সূত্রধর মানিক স্পষ্ট জানিয়েছেন, আন্দোলন চলাকালীন আল আমিনকে কখনো মাঠে দেখা যায়নি এবং রক্তাক্ত আন্দোলন কিংবা শিক্ষার্থী সাগর নিহতের দিনেও আল আমিন নামক কেউ আহত হননি; পরবর্তীতে হঠাৎ করেই তার ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ের গেজেট প্রকাশ পায়।

