“আমেরিকার শর্তে রুশ ডিজেল”: জ্বালানি নিরাপত্তায় কি সার্বভৌমত্ব বিসর্জন

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি যুদ্ধের দাবানলের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য এলো এক স্বস্তির খবর। রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল ডিঙিয়ে অবশেষে রুশ পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম (ডিজেল) আমদানির জন্য ৬০ দিনের বিশেষ ছাড় পেয়েছে বাংলাদেশ। ১১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া এই বিশেষ অনুমতির ফলে আগামী ৯ জুন পর্যন্ত রাশিয়ার তেল আমদানিতে ওয়াশিংটনের কোনো বাধা থাকবে না।

গত ১১ এপ্রিল মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকারকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। এর ফলে বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন) এখন একটি মার্কিন মধ্যস্থতাকারী কোম্পানির মাধ্যমে অন্তত ১০ লাখ টন রুশ ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে পড়ে। প্রথাগত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে তেল পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়লে বিপাকে পড়ে বাংলাদেশ। এমন পরিস্থিতিতে গত ৩০ মার্চ ঢাকা থেকে ওয়াশিংটনে একটি জরুরি চিঠি পাঠানো হয়। দীর্ঘ কূটনৈতিক তৎপরতা ও উচ্চপর্যায়ের ভার্চুয়াল বৈঠকের পর মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ও পররাষ্ট্র দপ্তর এই ছাড় দিতে সম্মত হয়।

এর আগে ১২ মার্চ মার্কিন কর্তৃপক্ষ মাত্র ৩০ দিনের একটি ছাড় দিয়েছিল, যা কার্যত বাংলাদেশের কোনো কাজে আসেনি। কারণ সেই লাইসেন্সটি ছিল কেবল ট্রানজিটে থাকা জাহাজের জন্য, অথচ তখন রাশিয়ার কোনো জাহাজই বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়নি। বর্তমানের ৬০ দিনের এই ‘উইন্ডো’ বাংলাদেশের জন্য নতুন এলসি (LC) খোলা এবং আমদানির পূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।

রাশিয়ার তেল আমদানিতে আমেরিকার এই বিশেষ ছাড়কে আপাতদৃষ্টিতে বড় কূটনৈতিক সাফল্য মনে হলেও, এর গভীরে রয়েছে কিছু বিতর্কিত ও সমালোচনামূলক দিক।

বিপিসি রাশিয়ার কাছ থেকে সরাসরি তেল কিনতে পারছে না। এই লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে একটি মার্কিন কোম্পানির মধ্যস্থতায়। প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশ যখন জ্বালানি নিরাপত্তার কথা বলছে, তখন কেন মার্কিন কোম্পানির হাত ধরে রুশ তেল আনতে হবে? এতে কি রাশিয়ার সস্তা তেলের বড় একটি লভ্যাংশ মার্কিন কোম্পানির পকেটে চলে যাচ্ছে না? দেশের স্বার্থের চেয়ে এখানে মার্কিন করপোরেট স্বার্থ কি বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে?

জ্বালানি বিভাগের চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ছাড়টি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে ‘সেতুবন্ধন’ হিসেবে কাজ করবে। এর অর্থ দাঁড়ায়, এই ৬০ দিনের ছাড়ের বিনিময়ে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে তার জ্বালানি খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এটি কি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ওপর বিদেশের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নীলনকশা?

রাশিয়া-ইউক্রেন ইস্যুতে বাংলাদেশ যখন নিরপেক্ষ অবস্থানের কথা বলে, তখন গোপনে মার্কিন মধ্যস্থতায় রুশ তেল কেনার এই প্রক্রিয়াটি এক ধরনের ‘দ্বিমুখী কূটনীতি’র বহিঃপ্রকাশ। জনগণের কাছে রাশিয়ার সাথে বন্ধুত্বের কথা বলা হলেও, তেলের চাবিকাঠি কার্যত ওয়াশিংটনের হাতেই তুলে দেওয়া হয়েছে। এই ‘পর্দার আড়ালের চুক্তি’ বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে খর্ব করে কি না, সেই বিতর্ক এখন তুঙ্গে।

৬০ দিনের এই ছাড় কেবল একটি সাময়িক তালি (Patchwork)। ৯ জুন পার হয়ে গেলে বাংলাদেশ আবার কোন শর্তে ছাড় চাইবে? প্রতিবার তেল কেনার জন্য ওয়াশিংটনের দরজায় কড়া নাড়া কি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য মর্যাদাপূর্ণ? এই কৌশলী ছাড় মূলত বাংলাদেশকে জ্বালানি খাতে আমেরিকার ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তোলার একটি কৌশল মাত্র।

জ্বালানি আমদানির এই ছাড় দেশের তেলের মজুদ নিশ্চিত করবে ঠিকই, কিন্তু এর বিনিময়ে বাংলাদেশ তার জ্বালানি অবকাঠামো ও নীতিনির্ধারণী বিষয়ে ওয়াশিংটনের প্রভাবকে কতটা জায়গা দিচ্ছে—তা এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *