নিজস্ব প্রতিনিধি :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হলে ছাত্রলীগের পদধারী নেতা সেজে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালানোর এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযুক্তের নাম আরিফুজ্জামান সৌরভ (২০১৯-২০ সেশন, আরবি বিভাগ), যিনি হল ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক ছিলেন। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, সৌরভ মূলত ইসলামী ছাত্রশিবিরের সক্রিয় কর্মী এবং সুকৌশলে ছাত্রলীগে ঢুকে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণসহ নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতেন।
বৈশাখী উৎসবে অংশ নেওয়াই ছিল ‘অপরাধ’
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মী ইশতিয়াক রাহুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৌরভের নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন।
রাহুল জানান, ২০২২ সালের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া এবং হলের সিনিয়র নেতার সঙ্গে ছবি তোলায় ক্ষিপ্ত হন সৌরভ। ওই রাতেই বিজয় একাত্তর হলের একটি কক্ষে নিয়ে রাহুলের ওপর চালানো হয় মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন।
নির্যাতনের ধরন সম্পর্কে রাহুল জানান,অন্ধকার ঘরে চোখের ওপর ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে মানসিক চাপ সৃষ্টি, অবিরত চড়-থাপ্পড়, লাথি এবং বালিশ দিয়ে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা,অকথ্য ভাষায় গালাগালির পর গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে প্রেরণ।
পরবর্তীতে কোনো কারণ ছাড়াই তাকে সাত দিনের জন্য হল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এসময় তিনি আরো বলেন, “আমার জীবনে অন্তত আটবার এমন ভয়াবহ ‘সিঙ্গেল গেস্টরুম’ বা ব্যক্তিগত নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে এই সৌরভের হাতে।”— ইশতিয়াক রাহুল, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী।
অভিযোগে আরও জানা যায়, ক্যাম্পাসে বিরোধী ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলকে প্রতিহত করার নামে জুনিয়রদের ওপর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন সৌরভ। পর্যাপ্ত ক্রিকেট স্টাম্প না থাকায় তিনি জুনিয়রদের নির্দেশ দিতেন গাছের ডাল কেটে ধারালো অস্ত্র বা লাঠি তৈরি করতে। যারা এসব অপকর্মে দ্বিমত পোষণ করতেন, তাদেরই টার্গেট বানাতেন এই ছদ্মবেশী নেতা। এমনকি সিগারেট না খাওয়া শিক্ষার্থীদের দিয়েও রাত আড়াইটায় সিগারেট আনিয়ে নেওয়া ছিল তার নিয়মিত ‘পাওয়ার প্র্যাকটিস’।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সৌরভের আসল রূপ প্রকাশ পেতে শুরু করে। রাহুলের দাবি এবং অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সৌরভের ফেসবুক প্রোফাইল বর্তমানে জামায়াত-শিবিরের কট্টর প্রচারণায় মুখর। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যখন তিনি ছাত্রলীগের পদধারী ছিলেন, তখন গোপনে শিবিরের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতেন এবং সুকৌশলে নির্যাতনের দায়ভার ছাত্রলীগের ওপর চাপিয়ে দিতেন।
ক্ষমতার সময় ছাত্রলীগের বড় নেতা, আর ক্ষমতার পালাবদলে শিবিরের সক্রিয় কর্মী। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পূর্বের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান মুছে এখন জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্ট পোস্টের ছড়াছড়ি।
অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি এখনো হলে অবস্থান করছেন এবং গোপনে উগ্রবাদী প্রচারণা চালাচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলা ‘গেস্টরুম কালচার’ এবং নির্যাতনের নেপথ্যে যে আসলে অনুপ্রবেশকারী ও স্বার্থান্বেষী মহল সক্রিয় ছিল, সৌরভের ঘটনাটি তার জলজ্যন্ত প্রমাণ। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতে, যারা অতি উৎসাহী হয়ে সাধারণ ছাত্রদের মারধর করত, তাদের অনেকেই ছিল মূলত অন্য সংগঠনের ‘প্ল্যান্টেড’ সদস্য।
বিশ্লেষকরা বলছেন,এই ধরনের অনুপ্রবেশকারীরাই ছাত্র রাজনীতিকে কলুষিত করেছে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ইশতিয়াক রাহুলের এই সাহসী প্রকাশ এখন ক্যাম্পাসের টক অফ দ্য টাউন। এখন দেখার বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই ‘ছদ্মবেশী’ নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়।

