অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬
একসময় বাংলাদেশের বড় বড় মেগা প্রকল্পে চীনা অর্থায়নের হিড়িক থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। নতুন কোনো বড় প্রকল্পে বেইজিংয়ের ঋণ প্রতিশ্রুতি কার্যত বন্ধ রয়েছে, যা দেশের সার্বিক উন্নয়ন সহযোগিতাকে থমকে দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বহু আলোচিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’র অর্থায়ন নিয়েও এখন তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের সূত্রের বরাতে জানা যায়, বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির সমীকরণ পরিবর্তনের কারণে চীন এই সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সাল থেকে চীন বাংলাদেশে ১ হাজার ১০৪ কোটি ডলারের অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও এ পর্যন্ত ছাড় হয়েছে প্রায় ৭৭২ কোটি ডলার। ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের পর থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এই সহযোগিতার সবচেয়ে বড় অংশটি এসেছিল। তবে ২০২১ সালে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং ২০২৩ সালে রাজশাহী ওয়াসা প্রকল্পের পর চীন আর নতুন কোনো বড় প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য ঋণের চুক্তি করেনি।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে। প্রারম্ভিক ধাপে বাংলাদেশ এ প্রকল্পের জন্য ৫৫ কোটি ডলারের ঋণ চেয়েছিল এবং চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতিও অনেক দূর এগিয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে তিস্তার অর্থায়ন নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী জানান, আগের ঋণ প্রস্তাব নিয়ে এবার আলোচনা হয়নি এবং পুরো প্রক্রিয়াটি সমীক্ষা দিয়ে নতুন করে শুরু হচ্ছে। এর ফলে এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও কয়েক বছর পিছিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনিক ধীরগতি চীনের আগ্রহ কমার মূল কারণ। বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম জানান, করোনার পর থেকে চীনের বিনিয়োগের ধারা কিছুটা বদলে গেছে। তবে বাংলাদেশ যদি চীনের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদন করতে পারে, তবে নতুন করে বিনিয়োগ বাড়ার পথ উন্মুক্ত হতে পারে।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, চীনা ঋণ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক একটু বেশিই করা হয়, যদিও বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের মাত্র ১০ শতাংশের কম চীন থেকে আসা। এছাড়া সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাস এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে চীন এখন নতুন ঋণ অনুমোদনে অতিরিক্ত সতর্কতা দেখাচ্ছে।
ঋণ প্রতিশ্রুতি কমলেও বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো নির্মাণ ও ঠিকাদারি খাতে এখনও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্য রয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ২৪০টি চীনা কোম্পানি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ ও নির্মাণ প্রকল্পে সরাসরি যুক্ত রয়েছে।

