নিজস্ব প্রতিবেদক | Info Bangla
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ১২ বছরের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে জাল-জালিয়াতির সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সোনালী ব্যাংক প্রায় ১০ লাখ ডলার ছাড় দেওয়ার প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে। সুদে-আসলে ১২ বছর আগের সেই এলসির মূল্য এখন তিনগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ লাখ ডলার। সমালোচিত ও বহুল বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান রোজবার্গ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, যার মালিক মো. হজরত আলী। তিনি শেরপুর জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতা। দ্বাদশ নির্বাচনে তিনি বিএনপি থেকে অনুমোদন না পেলেও তার মেয়ে ডাক্তার প্রিয়ঙ্কা নির্বাচনি প্রতিযোগিতায় হেরে যান।
মো. হজরত আলীর অনুকূলে খোলা ১৮টি এলসির বিপরীতে ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৭০০ ডলারসহ মোট প্রায় ৩০ লাখ ডলার ছাড়ের উদ্যোগ নিচ্ছে সোনালী ব্যাংক। রোজবার্গ ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে জাল (মাস্টার নেই) এলসি, নকল কাগজপত্র, ভুয়া ট্রাক চালান এবং সপ্তাহের ছুটির দিনে এলসি খোলাসহ বিভিন্ন অভিযোগ অডিট রিপোর্টে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের একটি কপি সোনালী ব্যাংকের সদর দপ্তরের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে রূপালী বাংলাদেশের হাতে এসেছে। সূত্র জানায়, ২০১২ সালে এসব এলসির কাগজপত্র জাল হওয়ার অভিযোগ ওঠে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তখন তদন্ত শুরু করলেও ১২ বছরেও অনুসন্ধান সম্পন্ন করতে পারেনি। একই ব্যক্তি ও কোম্পানির বিরুদ্ধে ৩০০ কোটি টাকারও বেশি ঋণ আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের দুটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
এরই মধ্যে এ অর্থ ছাড় দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে মোবাইল ফোনে চাপ প্রয়োগ করেছেন বলে জানা গেছে। এরপর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সংশ্লিষ্ট শাখাকে বিস্তারিত প্রতিবেদন দিতে বলেন। শাখা কর্তৃপক্ষ সদর দপ্তরে যে প্রতিবেদন দিয়েছে, সেখানে এলসি-সংক্রান্ত জালিয়াতির পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এ অর্থ ছাড় করলে রাষ্ট্রীয় ক্ষতি হবে এবং সোনালী ব্যাংকের ফোর্স লোন আরও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি ১৮টি বিলের অর্থ ছাড় না করার কারণ তুলে ধরে ফোর্স লোন মামলা দায়েরের অনুমতি চাওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালের ২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সোনালী ব্যাংকের ৯০৭তম বোর্ডসভায় বিষয়টি আলোচ্যসূচিতে ছিল। ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, যেকোনো মুহূর্তেই অর্থ ছাড়ের সিদ্ধান্ত হতে পারে। ১৩ পাতার প্রতিবেদনের ২ নম্বর মূল পয়েন্টে ‘শাখা কর্তৃক সংশ্লিষ্ট ১৮টি বিল পরিশোধে প্রতিবন্ধকতা’ শিরোনামে ৪টি উপ-পয়েন্টে বিল পরিশোধ না করার মোট ৭টি কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে- তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের নির্দেশে ডিএমডি খন্দকার মো. ইকবালের নেতৃত্বে গঠিত ১২ সদস্যবিশিষ্ট বিশেষ পরিদর্শন কমিটি বিলগুলো যাচাই করে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অনিয়ম চিহ্নিত করে।
মাস্টার এলসি নেই: বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন ফর ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রান্সজেকশনের নির্দেশনা মোতাবেক ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি স্থাপন করতে হলে ভ্যালিড মাস্টার এলসি থাকা আবশ্যক। রোজবার্গ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কথিত ১৮টি বিটিবি এলসিতে যে ৫টি মাস্টার এলসি/কন্ট্রাক্ট নম্বর দেখানো হয়েছে, বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। সাধারণত বিধি মোতাবেক মাস্টার এলসির বিপরীতে বিদেশে রপ্তানিকৃত পণ্যের প্রত্যাবাসিত রপ্তানি আয় থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির বিল মূল্য ম্যাচিউরিটি তারিখে পরিশোধ করা হয়। রোজবার্গ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কর্তৃক মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে উপস্থাপিত ১৮টি বিলে মাস্টার এলসি/কন্ট্রাক্টসমূহের বিপরীতে টি অ্যান্ড ব্রাদার্স নিট কম্পোজিট লিমিটেড ও ড্রেস মি ফ্যাশন লিমিটেড কর্তৃক বিদেশে পণ্য রপ্তানির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মাস্টার এলসিসমূহের বিপরীতে কোনো ফরেন কারেন্সি প্রত্যাবাসিত হয়নি: ১৮টি বিলে উল্লিখিত মাস্টার এলসিগুলোর সত্যতা না থাকায় এবং বিদেশে কোনো পণ্য রপ্তানি না হওয়ায় এলসিগুলোর বিপরীতে কোনো ফরেন কারেন্সি প্রত্যাবাসিত হয়নি।
জাল-জালিয়াতির সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়ে চারটি সুপারিশ করেছে পরিদর্শন কমিটি। সেখানে প্রথমে বলা হয়েছে, ১৮টি বিটিবি এলসির মধ্যে ৪টি এলসি (যথা- ০৩৭০১১০৪৩৩৫৬, ০৩৭০১১০৪৩৩৫৫, ০৩৭০১১০৪৩৩৫৬ ও ০৩৭০১১০৪৩৩৫৭) সাপ্তাহিক ছুটির দিন (২.১২.২০১১) দেখানো হয়েছে, যা অবাস্তব এবং জাল-জালিয়াতির প্রমাণ।
তাছাড়া, বিলের সঙ্গে উপস্থাপিত ট্রাক চালানগুলোতে (ট্রাক নং ঢাকা মেট্রো-ম: ৫১-৩১৮১) উল্লেখ রয়েছে। বিআরটিএ কর্তৃক রেজিস্ট্রেশনের তথ্য মোতাবেক ট্রাকের পরিবহন বা ধারণক্ষমতা ৯৭৫ কেজি। অথচ ১৮টি বিলের প্রতিটির বিপরীতে ট্রাকে সরবরাহ দেখানো পণ্যের পরিমাণ অনেকগুণ বেশি, যা বাস্তবিক নয়।
তৃতীয় ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এ শাখায় সুইফট সুবিধা থাকলেও ১৮টি এলসির সব কটিই ম্যানুয়ালি স্থাপিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইনস ফর ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রান্সজেকশনে (জিএফইটি) বলা হয়েছে, ৫ হাজার মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ মূল্যের এলসি অবশ্যই সুইফট বা অনুরূপ কোনো নিরাপদ মাধ্যমে অ্যাডভাইজিং ব্যাংকে পাঠাতে হবে। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্ণিত নির্দেশনা পরিপালন করা হয়নি।
সবশেষে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইনস ফর ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রান্সজেকশনে (জিএফইটি) বলা হয়েছে, উপর্যুক্ত নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে পিটিশনার প্রকৃত উৎপাদক ও সরবরাহকারী কি না সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে ব্যাংকের পরিদর্শক দল সরেজমিনে সরবরাহকারীর ফ্যাক্টরি-কারখানা পরিদর্শনপূর্বক রিপোর্ট দাখিল করা হয়েছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘পরিদর্শনকালে কারখানায় কোনো সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। কারখানা চালু থাকলেও কারখানার অবকাঠামোগত সুবিধাদি এবং বিদ্যমান মেশিনারিজের উৎপাদন সক্ষমতা বিবেচনায় সরবরাহকৃত পণ্যের পরিমাণ অত্যধিক বলে প্রতীয়মান হয়েছে।’ বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ উঠলে ২০১২ সালের ১৫ জুলাই অনুসন্ধানের জন্য ৬ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে দুদক। তবে অদৃশ্য কারণে দুদকের অনুসন্ধান আর এগোয়নি।
২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর দুদকের উপপরিচালক মোসা. মাহফুজা খাতুন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘মেসার্স রোজবার্গ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ১৮টি বিলের বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক লিমিটেড, কাওরান বাজার করপোরেট শাখা, ঢাকা

