বিশেষ প্রতিবেদন: ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল—দীর্ঘ এই দেড় দশকে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতির পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে বিদ্যুৎ খাতের অভূতপূর্ব রূপান্তর। ২০০৯ সালের শুরুতে যেখানে লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে স্থবির হয়ে পড়েছিল দেশের অর্থনীতি ও জনজীবন, সেখান থেকে শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগ সরকারের সুদূরপ্রসারী নীতি এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপে বাংলাদেশ আজ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আলোকিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
২০০৯ সালের শুরুতে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল মাত্র ৩,২৬৭ মেগাওয়াট, বিপরীতে জাতীয় চাহিদা ছিল প্রায় ৫,২০০ মেগাওয়াট। তৎকালীন এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো।
তবে সরকারের যুগান্তকারী ও সাহসী পদক্ষেপে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয় প্রায় ২৪,৯৭৯ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ। উৎপাদন সক্ষমতার এই অভাবনীয় বৃদ্ধি দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি স্থাপন করে।
বিদ্যুৎ সুবিধা কেবল শহরের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দিতে নেওয়া হয়েছিল ব্যাপক কর্মসূচি।
- বিদ্যুৎ-অ্যাক্সেস বৃদ্ধি: সরকারের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও বাস্তবায়নের ফলে ২০১৪ সালের মধ্যেই দেশের বিদ্যুৎপ্রাপ্তির হার ৪৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২ শতাংশে উন্নীত হয় এবং পর্যায়ক্রমে তা শতভাগ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়।
- সঞ্চালন লাইন সম্প্রসারণ: বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সঞ্চালন ব্যবস্থার যুগোপযোগী উন্নয়ন করা হয়। ২০০৯ সালে দেশে সঞ্চালন লাইন ছিল মাত্র ৮,০০০ সার্কিট কিলোমিটার। ২০২৪ সালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১৪,৯৬০ সার্কিট কিলোমিটারে উন্নীত হয়।
একপেশে জ্বালানি নির্ভরতা কাটিয়ে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুমুখী জ্বালানি মিশ্রণের ওপর জোর দেয় তৎকালীন সরকার। গ্যাসের পাশাপাশি কয়লা, তরল জ্বালানি, পারমাণবিক এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আওতায় আনা হয়।
এই নীতিমালার আওতায় বাস্তবায়ন করা হয় দেশের ইতিহাসের বেশ কিছু মেগা প্রকল্প:
- রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র: পরমাণু ক্লাবে বাংলাদেশের প্রবেশের ঐতিহাসিক মাইলফলক।
- পায়রা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র: আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির বড় বড় কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে গ্রিডের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়ানো হয়।
- আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্য: ভারতের সাথে আন্তঃদেশীয় গ্রিড সংযোগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ আমদানির সক্ষমতা তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে ভারতের ঝাড়খণ্ডের আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকেও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়।
বিদ্যুৎ খাতের এই রমরমা সম্প্রসারণ দেশের সামগ্রিক উৎপাদন খাতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জোগান পাওয়ায় শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি এবং আবাসিক খাতে সংযোগ ও ব্যবহার বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাত এক নতুন গতি লাভ করে, যা দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বা জ্বালানি আমদানির কিছু আর্থিক চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা থাকলেও, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের নেওয়া বিদ্যুৎ খাতের সাহসী ও দূরদর্শী পদক্ষেপগুলো অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এই খাতের অবকাঠামোগত ভিত্তি মজবুত হওয়ার ফলেই বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি লোডশেডিংয়ের অন্ধকার কাটিয়ে আজকের এই শিল্পসমৃদ্ধ ও আধুনিক বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যেতে পেরেছে।

