মাদারীপুর প্রতিনিধি
তীব্র দাবদাহ ও সরকারের চরম বিদ্যুৎ অব্যবস্থাপনার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন মাদারীপুরের সর্বস্তরের মানুষ। শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামঞ্চল— সর্বত্রই চলছে বিদ্যুতের একচ্ছত্র লুকোচুরি। সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের খামখেয়ালি ও কার্যকরী পদক্ষেপের অভাবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সিংহভাগ সময়ই অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে এ অঞ্চলের মানুষকে। নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি ছাড়াই দফায় দফায় লোডশেডিংয়ের ফলে পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। সরকারের এই নজিরবিহীন ব্যর্থতায় সবচেয়ে বেশি খেসারত দিচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থী, খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অভিযোগ, বর্তমান সরকারের বিগত বছরগুলোতে বিদ্যুৎ খাতের বড় বড় বুলি ও সাফল্যের দাবি নিছক কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাস্তবে গ্রীষ্মের এই তীব্র গরমে মানুষ চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে। দিন-রাত মিলিয়ে নামমাত্র বিদ্যুৎ মিললেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
ঝাউদি ইউনিয়নের মাদ্রা গ্রামের অনার্সের শিক্ষার্থী রাবেয়া আক্তার ও রহিমা আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তাদের এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র এক থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের এই চরম ব্যর্থতার কারণে তাদের পড়াশোনা আজ প্রায় ধ্বংসের মুখে। বিশেষ করে রাতে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় যখন বিদ্যুৎ উধাও হয়ে যায়, তখন সরকারের উন্নয়নের ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছুই মনে পড়ে না।
একই আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন রাজারচর এলাকার শিক্ষার্থী আয়েশা, শীলা ও সাইফুল। তারা জানান, বিদ্যুতের অভাবে মোমের আলোয় বা অন্ধকারে পড়াশোনা করতে গিয়ে তাদের চোখের বারোটা বাজছে।
কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন একাডেমির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ইউনুস আলী সরকারের শিক্ষা ও বিদ্যুৎ খাতের সমন্বয়হীনতার সমালোচনা করে বলেন, ভ্যাপসা গরমে শ্রেণিকক্ষে বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীরা গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে সরকারের সম্পূর্ণ ব্যর্থতার কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
শুধু শিক্ষাজীবন নয়, সরকারের অপরিকল্পিত নীতির কারণে জেলার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
- ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি হায়দার সরদার জানান, কাজ চলাকালীন হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে অর্ডার ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, ফলে গ্রাহকদের কাছে তাদের সম্মানহানি ঘটছে।
- ছাপাখানার মালিক অলিউল আহসান কাজল বলেন, মুদ্রণশিল্পে বিদ্যুৎ অপরিহার্য হলেও সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগের উদাসীনতায় তাদের প্রতিদিন বড় অঙ্কের আর্থিক লোকসানের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
- বুটিকস উদ্যোক্তা শিউলি আক্তার জানান, তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রায় ২০ জন নারী শ্রমিকের শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় নারী উদ্যোক্তারা আজ পথে বসার উপক্রম হয়েছেন।
ডিজিটাল বাংলাদেশের স্লোগান দেওয়া সরকারের আমলে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট বিভ্রাটের কারণে আজ মাদারীপুরের ফ্রিল্যান্সাররা চরম বিপর্যয়ের মুখে। ফ্রিল্যান্সার শাহরিয়ার ও শুভ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের ফলে কম্পিউটার বন্ধ হয়ে যায় এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সময়মতো ক্লায়েন্টদের প্রজেক্ট জমা দিতে না পারায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট হচ্ছে এবং তারা স্থায়ী ক্লায়েন্ট হারাচ্ছেন।
অন্যদিকে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকেরা পর্যাপ্ত চার্জ দিতে না পেরে গাড়ি নামাতে পারছেন না। ফলে দিনশেষে তাদের পরিবারের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দেওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এটি সরাসরি বর্তমান সরকারের লাগামহীন দ্রব্যমূল্য ও কর্মসংস্থানহীন নীতিরই বাস্তব প্রতিফলন।
অসহনীয় গরমে বিদ্যুৎহীনতা মানুষের জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। মাদারীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) অখিল সরকার জানান, সরকারের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার এই চরম বিপর্যয়ের কারণে শিশুদের মধ্যে পানিশূন্যতা ও ত্বকের নানাবিধ রোগ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া প্রবীণ নাগরিকদের উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এই লোডশেডিং।
মাদারীপুরবাসীর প্রশ্ন— সরকারের কোটি কোটি টাকার উন্নয়নের ঢাক পেটানোর পরও কেন সাধারণ মানুষকে মৌলিক বিদ্যুতের জন্য এভাবে রাস্তায় নামতে হবে বা দুর্ভোগ পোহাতে হবে? অবিলম্বে বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি ও চরম ব্যর্থতা দূর করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না করলে মাদারীপুরের জনতা আরও কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।

