অনলাইন ডেস্ক: প্রাণ বাঁচাতে মাত্র ৩০-৪০ মিনিটের নোটিশে ঢাকার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘গণভবন’ ছাড়তে হয়েছিল শেখ হাসিনাকে। আকস্মিক এই পরিস্থিতির কারণে পদত্যাগ করার কোনো সময় বা সুযোগ তিনি পাননি। এমনকি তিনি যে দেশ ছাড়ছেন, সেটিও একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জানতেন না বলে দাবি করেছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
সম্প্রতি ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘এই সময়’-এর লিখিত প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনকে ‘সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র’ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায়কে ‘প্রতিশোধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তিনি।
‘ভ্যানিটি ব্যাগে পদত্যাগপত্র’ নিয়ে ওঠা দাবি নাকচ;
ঢাকার একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকের দাবি ছিল— ৫ আগস্ট আন্দোলনকারীরা গণভবন ঘিরে ফেললে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে তিন পাতার একটি পদত্যাগপত্র লিখেছিলেন এবং তড়িঘড়ি দেশ ছাড়ার সময় সেটি নিজের ভ্যানিটি ব্যাগে পুরে নিয়ে যান।
এই দাবিকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন,”আমাকে পদত্যাগ করার সময় দেওয়া হয়নি। সংবিধান অনুযায়ী স্বহস্তে লিখিত পদত্যাগপত্র সশরীরে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সামনে উপস্থিত থেকে তাঁর হাতে তুলে দেওয়াটাই নিয়ম। কিন্তু সে সুযোগ আমি পাইনি। গণভবন আক্রমণ করতে এলে আমার হাতে সাকুল্যে ৩০-৪০ মিনিট সময় ছিল।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমি টুঙ্গিপাড়ায় চলে যাব বলে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। প্রকৃতপক্ষে আমি জানতামই না, দেশের বাইরে যাচ্ছি।” বোন রেহানা এবং তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়েই আন্দোলনকারীরা গণভবনে আক্রমণ করেছিল দাবি করে শেখ হাসিনা বলেন, সেই অল্প সময়ে বসে বসে পদত্যাগপত্র লেখার কোনো সুযোগই তাঁর ছিল না।
আইসিটির রায় নিয়ে বক্তব্য বলেন,জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে প্রাণহানির ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া প্রসঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন,
“অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার বেআইনি ভাবে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। আমাকে যে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে, সেটি কোনও বিচার নয়, এটি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশোধ মাত্র।”
তিনি দাবি করেন, প্রথম হতাহতের ঘটনার পরই সঠিক তদন্তের জন্য তাঁর সরকার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করে দিয়েছে এবং নিহতদের লাশের ময়নাতদন্ত পর্যন্ত করতে দেয়নি।
শেখ হাসিনা দাবি করেন, ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের আন্দোলনটি কোনো স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ছিল না। কোটা পরিবর্তনের দাবির আড়ালে এটি ছিল দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর একটি সুপরিকল্পিত ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র। এর প্রমাণ হিসেবে তিনি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যকে উদ্ধৃত করেন, যেখানে ইউনূস নিজেই এই আন্দোলনকে ‘মেটিকুলাসলি ডিজাইনড’ (সুনিপুণভাবে নকশাকৃত) বলে উল্লেখ করেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্ররা নিজেরাই প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে যে আন্দোলন সফল করতে তারা পুলিশ হত্যা ও মেট্রোরেলে আগুন দিয়েছিল।
জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের (ওএইচসিএইচআর) প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তুলে শেখ হাসিনা বলেন, তারা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমন্ত্রণে তদন্ত করেছিল, তাই এই প্রতিবেদন স্বাধীন বা নিরপেক্ষ হতে পারে না। ওএইচসিএইচআর-এর প্রতিবেদনে ১,৪০০ মানুষ নিহতের দাবি করা হলেও এর কোনো প্রমাণ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, খোদ অন্তর্বর্তী সরকারের গেজেট অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৮৩৪, এবং সেখানেও মিথ্যা নাম যোগ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার ভলকার টুর্কের ২০২৫ সালের মার্চের একটি সাক্ষাৎকারের সূত্র ধরে হাসিনা বলেন, “তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, আন্দোলন দমনে কঠোর হলে শান্তিরক্ষী মিশন থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। এটি দৃশ্যতই একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সামিল। এটা পরিষ্কার যে, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।”

