ময়মনসিংহ প্রতিনিধি: একসময় কৃষিতে নতুন স্বপ্নের বীজ বুনতেন, জীবিকার প্রয়োজনে ধরেছিলেন অটোরিকশার স্টিয়ারিং, আর মেধা ও রাজপথের শ্রমে সচল ছিলেন সামাজিক আন্দোলনে—সেই তরুণ ফরহাদ হোসেন (৩৫) শেষ পর্যন্ত হেরে গেলেন এক নৃশংসতার কাছে। শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ায় দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন তিনি। আজ বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুকোলে ঢলে পড়েন এই যুবক।
নিহত ফরহাদ মুক্তাগাছা পৌর শহরের মধ্যহিস্যা এলাকার আব্দুস সাত্তারের বড় ছেলে। পিতা বার্ধক্যজনিত কারণে কর্মক্ষমতা হারানোর পর পুরো পরিবারের দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধেই।
জলাশয়ে ঝাঁপ দিয়েও হলো না শেষ রক্ষা
ঘটনার সূত্রপাত ৯ সেপ্টেম্বর, বুধবার রাত ১০টার দিকে। বাড়ি থেকে বের হয়ে কিছুদূর যেতেই নির্জন মধ্যহিস্যা এলাকায় হামলার শিকার হন ফরহাদ। মৃত্যুর আগে হাসপাতালে শুয়ে পুলিশের কাছে দেওয়া বর্ণনায় ফরহাদ জানান, অজ্ঞাত দুই ব্যক্তি হঠাৎ পেছন থেকে এসে তাঁর শরীরে পেট্রোল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। শরীরজুড়ে আগুনের লেলিহান শিখা নিয়ে জীবন বাঁচাতে পাশের একটি জলাশয়ে ঝাঁপ দেন তিনি।
চিৎকার শুনে স্থানীয়রা আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে মুক্তাগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। তবে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
সামাজিক প্রতিবাদ নাকি মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই—হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী?
ফরহাদ শুধু একজন অটোচালক ছিলেন না; এলাকার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের আন্দোলন এবং সামাজিক নানা কর্মকাণ্ডে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। এমনকি গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রচারণাও চালিয়েছিলেন।
তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের দাবি, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকতে পারে মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান। ফরহাদের বাড়ির পাশে প্রতিনিয়ত বসত মাদকসেবীদের আড্ডা। একাধিকবার তিনি এতে বাধা দেন, যা নিয়ে স্থানীয় বখাটে ও মাদকচক্রের সঙ্গে তৈরি হয় বিরোধ। বাবা আব্দুস সাত্তারের ধারণা, মাদকের প্রতিবাদ ও সামাজিক আন্দোলনের সক্রিয়তাই তাঁর ছেলের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তদন্তে পুলিশ
মুক্তাগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুল ইসলাম ঘটনার ভয়াবহতা স্বীকার করে জানান, ফরহাদ মৃত্যুর আগে হামলাকারীদের চিনতে না পারলেও ঘটনার বিবরণ দিয়ে গেছেন। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে রাখা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের আসল কারণ অনুসন্ধানে পুলিশ জোর তদন্ত শুরু করেছে এবং এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

