চাঁদপুর প্রতিনিধি: আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশ যখন চরম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে চাঁদপুর জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল ফাঁকা করার জোর তৎপরতা চালায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র। নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান ওসমান গণি পাটোয়ারী অপসারণের মাত্র এক দিন আগে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ইস্যু করা হয় ১৭টি চেক। এই ১৭টি চেকের মাধ্যমে এক দিনেই তোলা হয় প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর ঠিক চার দিন আগে, ১৪ আগস্ট আরও ৪টি প্রকল্পের নামে তোলা হয়েছিল ১৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র দুই দিনে ২১টি চেকের মাধ্যমে মোট ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা রাজকোষ থেকে বের করে নেওয়া হয়েছে।
ভুয়া প্রজেক্ট ও ‘জিরো ওয়ার্ক’ বিল
অনুসন্ধানে জানা যায়, যেসব প্রকল্পের নামে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ তোলা হয়েছে, তার একটি বড় অংশের বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই ছিল না। জেলা পরিষদের হলরুমের ওয়াল টাইলসকরণ, ভবন সংস্কার ও রং করার নামে মেসার্স শরীফ অ্যান্ড ব্রাদার্স ও মেসার্স আরিফুল ইসলাম এন্টারপ্রাইজের অনুকূলে প্রায় ১৬ লাখ টাকা বিল উত্তোলন করা হয়। তবে বাস্তবে জেলা পরিষদ ভবনে এ ধরনের কোনো কাজই করা হয়নি।
হিসাবমতে, ১৮ আগস্ট ইস্যু করা ১৭টি চেকের মধ্যে তৎকালীন চেয়ারম্যানের আত্মীয় ঠিকাদার শেখ নজরুল ইসলামের একাই ছিল ৭টি প্রজেক্ট। একদিনেই তার নামে দেওয়া হয় প্রায় ৭০ লাখ টাকার বিল! বাবুরহাট বাজারের সাইট প্রস্তুত ও বালু ভরাটের কাজের জন্য নামমাত্র কিছু বালু ফেলে পুরো ২৭ লাখ টাকার বিল তুলে নেওয়া হয়।
ঠিকাদারদের বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি ও ঘুষের খেলা
জালিয়াতির এই প্রক্রিয়ায় যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ব্যবহার করা হয়েছিল, তাদের বক্তব্যেই বেরিয়ে এসেছে থলের বিড়াল। ঠিকাদার আরিফুল ইসলাম জানান, তিনি প্রজেক্ট পাস হওয়া বা কাজের ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। জেলা পরিষদের প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন সকালে তাকে ফোন করে ব্যাংকে নিয়ে চেক ক্যাশ করান এবং বিকেলে তোলা টাকার মধ্যে প্রায় ১৮ লাখ টাকা প্রকৌশলী নিজেই তার কাছ থেকে বুঝে নেন। অন্য এক ঠিকাদার শরীফ প্রথমে কাজ করার কথা অস্বীকার করলেও পরে mysteriously নিজের বক্তব্য পরিবর্তন করেন।
শেষ মুহূর্তে ফেঁসে যাওয়া ৩৪ লাখ টাকা
শুধু ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকাতেই এই লুটপাট থেমে থাকেনি। আরও ৩৪ লাখ টাকার ৫টি চেক সম্পূর্ণ তৈরি ছিল উত্তোলনের জন্য। কিন্তু তৎকালীন চেয়ারম্যান অপসারণ হওয়ায় শেষ রক্ষা হয়নি, চেকগুলো শেষ পর্যন্ত বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে তৎকালীন জেলা পরিষদ প্রশাসক সেলিম উল্লাহ সেলিম সরেজমিনে তদন্ত করে জানান, ঐ ৩৪ লাখ টাকার চেকের বিপরীতে কোনো প্রজেক্ট ফাইল বা কাজের অস্তিত্ব ছিল না।
বর্তমানে জেলা পরিষদের প্রাক্তন প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন ও প্রাক্তন নির্বাহী কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেনের দায় এড়ানোর বক্তব্য এবং ঠিকাদারদের পরস্পরবিরোধী তথ্যে থমকে আছে রাজস্ব তহবিল আত্মসাথের পুরো বিষয়টি।
দুদকের জালে জালিয়াতি চক্র
চাঁদপুর জেলা পরিষদের বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কবির হোসেন সরদার জানিয়েছেন, বিষয়টি ইতোমধ্যেই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরে এসেছে এবং তদন্ত শুরু হয়েছে। দুদকের চাহিদানুযায়ী সমস্ত নথিপত্র হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। চাঁদপুরবাসীর এখন একটাই দাবি—সরকার পরিবর্তনের ঘোলা পানিতে যারা জনগণের করের টাকা লুটপাট করেছে, তদন্তের মাধ্যমে তাদের প্রত্যেকের মুখোশ উন্মোচন করে আইনের আওতায় আনা হোক।

