বিশেষ প্রতিনিধি: সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোহাম্মদ সাদিকুল হক সাদেকের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা, দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা এবং জামিন ও মুক্তির প্রক্রিয়ার ঠিক পরপরই নতুন পুরোনো মামলায় শোন অ্যারেস্ট (Show-Arrest) দেখানোর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তাঁর পরিবার এবং আইনি পর্যবেক্ষণ মহল। পুরো প্রক্রিয়াটিকে আইনি কাঠামোর অপব্যবহার (abuse of process of court) এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
ঘটনা এবং আইনি প্রক্রিয়ার পর্যায়ক্রমিক বিবরণ বিশ্লেষণ করে পরিবার ও আইনি সংশ্লিষ্টরা একাধিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৯ মে খিলক্ষেত থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলার পর গত ১৭ জুলাই ২০২৫-এ মেজর সাদেক সামরিক/আর্মি হেফাজতে যান। হেফাজতে থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী দীর্ঘ ১৩ মাস ওই মামলায় কোনো কার্যকর আইনি পদক্ষেপ বা তদন্ত শেষ করা হয়নি, যা ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ১৭৩ ধারার “যথাসম্ভব দ্রুত” (without unnecessary delay) তদন্ত নিষ্পত্তির নীতির বিপরীত।
পরবর্তীতে ১১ নভেম্বর ২০২৫-এ ভাটারা থানায় দায়ের করা মামলায় ১০ আগস্ট ২০২৬-এ তাঁকে শোন অ্যারেস্ট দেখানোর আবেদন জানায় পুলিশ। তবে ১৬ আগস্ট ২০২৬ বিজ্ঞ আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, আসামি ইতোমধ্যে সামরিক হেফাজতে রয়েছেন। এই পর্যালোচনার ভিত্তিতে আদালত পুলিশের শোন অ্যারেস্ট আবেদন নাকচ করেন এবং সংশ্লিষ্ট থানাকে উল্টো কারণ দর্শানোর (show-cause) নোটিশ দেন।
বিচারিক আদালতের এই আদেশের পরদিন ১৭ আগস্ট ২০২৬, যখন অন্য কোনো আটকাদেশ না থাকায় তাঁর মুক্তির আইনগত পথ সুগম হচ্ছিল, ঠিক তখনই ১৯ মে ২০২৫-এর পুরোনো মামলাটি হঠাৎ সক্রিয় করে তোলা হয়। এর পরদিন ১৮ আগস্ট ২০২৬-এ খিলক্ষেত থানার পুরোনো মামলাটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন আদালত। আইনজীবীদের প্রশ্ন, আসামি দীর্ঘদিন হেফাজতে থাকা সত্ত্বেও CrPC ৭৩–৭৫ ধারা অনুযায়ী আগের ওয়ারেন্ট কেন সময়মতো কার্যকর করা হয়নি এবং মুক্তির পরপরই কেন নতুন করে এই প্রয়োজনীয়তা তৈরি হলো। অভিযোগ উঠেছে, এই দীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তা ও মুক্তির মুহূর্তে পুরোনো মামলা সক্রিয় করা ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১A ধারার আওতায় আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহারের স্পষ্ট নির্দেশক।
এদিকে, বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মেজর সাদেকের স্ত্রী সুমাইয়া জাফরিন স্বামীর আইনি সহায়তায় আদালতে নিয়মিত যাতায়াত করেন। কিন্তু আদালত প্রাঙ্গণে তাঁর উপস্থিতি ও ছোটাছুটির দৃশ্য গোপনে ক্যামেরাবন্দি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর ও হেয়প্রতিপন্নমূলকভাবে উপস্থাপন করার অভিযোগ তুলেছেন পরিবার।
স্বজনদের ভাষ্য, একজন স্ত্রী তাঁর স্বামীর মুক্তির জন্য আইনি লড়াই চালাবেন ও আদালতে আসবেন—এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক মানবিক দায়িত্ব। এই মানবিক পদক্ষেপকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা তাঁদের মানসিক হয়রানি করারই আরেকটি রূপ। সুশীল সমাজ ও আইনি বিশ্লেষকদের মতে, একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তার ক্ষেত্রে যদি আইনি প্রক্রিয়ার এমন পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে তা সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। জনমনে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নিয়ে সৃষ্ট এই অসন্তোষ দূর করতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

