নিজস্ব প্রতিবেদক | কুমিল্লা
কুমিল্লায় দীর্ঘ আড়াই বছর পর গোপনে নিজ বাড়িতে ফিরেছিলেন মো. আনোয়ার হোসেন (৪৫)। কিন্তু ঘরে ফেরার আনন্দ স্থায়ী হলো না। স্ত্রী-সন্তানের চোখের সামনে তাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি হামলার পর ঘটনাটি আড়াল করতে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়—‘ডাকাত পড়েছে’।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ৪টার দিকে নবগঠিত বাঙ্গরা উপজেলার উত্তর পেন্নাই গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত আনোয়ার শ্রীকাইল ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ও একই ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি ছিলেন।
নিহতের স্ত্রী মোমেনা বেগমের অভিযোগ, প্রায় আড়াই বছর আত্মগোপনে থাকার পর শনিবার গভীর রাতে আনোয়ার গোপনে বাড়িতে ফেরেন। বিষয়টি জানতে পেরে রাত সাড়ে ৩টার দিকে সাবেক ইউপি সদস্য ফিরোজ হোসেনের নেতৃত্বে একদল লোক দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। আনোয়ারকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। স্বামীকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে মোমেনাকেও আহত করা হয়।
মোমেনার দাবি, হামলার পর পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নিতে মসজিদের মাইকে ‘ডাকাত পড়েছে’ বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। আহত আনোয়ারকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাদের আটকে রাখা হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় সকাল ৬টার দিকে তাকে উদ্ধার করে মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ধারণা করা হচ্ছে, হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আনোয়ার ও সাবেক ইউপি সদস্য ফিরোজ হোসেনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। এরপর আনোয়ার এলাকা ছেড়ে চলে যান। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও তিনি একাধিকবার এলাকায় ফেরার চেষ্টা করেন।
নিহতের চাচাতো ভাই মো. জসিম উদ্দিনের অভিযোগ, এলাকায় ফিরতে চাইলে আনোয়ারের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। টাকা না দিলে এলাকায় ফিরলে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। তার দাবি, পরিকল্পিতভাবেই আনোয়ারকে হত্যা করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফিরোজ হোসেন। তার দাবি, আনোয়ার অতীতে আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ লোকজনই তাকে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
বাঙ্গরা বাজার থানার ওসি মো. শফিউল আলম জানান, আনোয়ারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ঘটনায় ছয়টি মামলা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে পূর্ববিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত চলছে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
একটি রাত, একটি ঘরে ফেরা—আর তারপরই মৃত্যু। যে মানুষটি আড়াই বছর পর নিজের ঘরে ফিরেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই ঘরেই স্ত্রী-সন্তানের সামনে প্রাণ হারালেন। তার মৃত্যুর বিচার এখন পরিবারের অপেক্ষা।

