রাঙামাটি প্রতিনিধি:

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় রাঙামাটি জেলায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জেলার সড়ক, কালভার্ট, কৃষিজমি ও মৎস্য ঘেরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্যা ও পাহাড় ধসের ঘটনায় জেলায় এ পর্যন্ত ১৩৫টি স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে এবং তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। সব মিলিয়ে বন্যায় এক লাখ ৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের জন্য সরকারি বরাদ্দ এসেছে অত্যন্ত অপ্রতুল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্তদের মাথাপিছু নগদ বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩২ টাকা করে।​

রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এবারের বন্যা ও পাহাড় ধসে জেলায় মোট ১ লাখ ৮ হাজার ৭১৭ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর বিপরীতে সরকারিভাবে মাত্র ৩৫ লাখ টাকা এবং ২৯৫ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২ হাজার ৩১৪ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে, যার সুবিধা পেয়েছেন ৩২ হাজার ৫৪৬ জন। অর্থাৎ, ৭৬ হাজার ৭১৭ জন মানুষ এখনও সরকারি কোনো সুবিধার আওতায় আসেননি। জেলার মোট বরাদ্দের ৩৫ লাখ টাকা ও ২৯৫ টন চাল ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ভাগ করে দিলে মাথাপিছু বরাদ্দ দাঁড়ায় মাত্র ৩২ টাকা এবং ২৭০ গ্রাম চাল।​

বর্তমানে বাঘাইছড়ি ও বিলাইছড়ির ফারুনা ইউনিয়ন থেকে পানি নেমে যাওয়ায় দুর্গতরা ঘরবাড়ি পুনর্গঠনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তবে সড়ক যোগাযোগ এখনো স্বাভাবিক হয়নি; বিশেষ করে বাঘাইছড়ির সঙ্গে খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। পানির প্রবল স্রোতে বসতঘর হারিয়ে দিশেহারা অনেক পরিবার এখন ত্রাণের বদলে ঘর পুনর্গঠনে সরকারি সহায়তা দাবি করছে।​জেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, বন্যায় আনুমানিক ৪৮৩টি বসতঘর, ৩২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ২৫টি সেতু-কালভার্ট এবং ৫৪৬.৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া কৃষিখাতে ৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর ফসলি জমি এবং মৎস্যখাতে প্রায় ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৩২ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

​তিনি আরও জানান, বরাদ্দকৃত ২৯৫ মেট্রিক টন চালের মধ্যে রাঙামাটি সদর ও পৌরসভায় ৪০, লংগদু ২০, কাউখালী ৩০, বরকল ২০, বাঘাইছড়ি ৪৫, জুরাছড়ি ১০, নানিয়ারচর ১০, কাপ্তাই ৫০, বিলাইছড়ি ৫০ এবং রাজস্থলীতে ২০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঘাইছড়ি উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন ও বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়ন।​

বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জাকির হোসেন জানান, ফারুয়া বাজারের ৭২টি দোকান এবং ১ হাজার ৯৮২টি বসতঘর বন্যার পানিতে ডুবে ছিল, যার মধ্যে ২৭৪টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থায়ী সমাধানের জন্য ব্যবসায়ীরা বাজারটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার দাবি জানালেও বন বিভাগের আইনি জটিলতায় তা আটকে আছে। অন্যদিকে, বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার আমেনা মারজান জানান, উপজেলার ৮০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল এবং ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দি ছিল। বর্তমানে দুটি আশ্রয়কেন্দ্রে ২৯৫ জন মানুষ অবস্থান করছেন।​

প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে প্রতিটি উপজেলায় বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্তদের ফাইবার বোট প্রদান এবং পুনর্বাসনের জন্য ঢেউ টিন ও নগদ অর্থ মঞ্জুরির প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে।

​রাঙামাটির সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-এর সদস্য মো. আলী বলেন, “আমি জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেছি। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে কিছুটা অব্যবস্থাপনা ছিল। অনেকেই লোকলজ্জার ভয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আসেননি, ফলে তারা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। যারা সব হারিয়ে নিরুপায় হয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছেন, কেবল তারাই সরকারি সুবিধা পেয়েছেন। তবে সেই খাবার ও বরাদ্দ কোনোভাবেই পর্যাপ্ত ছিল না।

“​রাঙামাটি প্রেস ক্লাবের সভাপতি আনোয়ারুল হক দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “পার্বত্য তিন জেলায় অতীতে বন্যায় ও পাহাড়ধসে এতো মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কখনো হয়নি। জেলা প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অত্যন্ত হতাশাজনক। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সরকারি সহায়তা আরও বৃদ্ধি করা জরুরি।”

Leave A Reply

যোগাযোগ
ইমেইল: contact@infobangla.news
ওয়েবসাইট: InfoBangla.news

© ২০২৬ InfoBangla.news — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
InfoBangla.news এ প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, ভিডিও বা যেকোনো কনটেন্ট পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার, পুনঃপ্রকাশ বা বিতরণ আইনত দণ্ডনীয়।

Exit mobile version