শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধে সরকারের এক মহৎ উদ্যোগ ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচি। তবে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে এই প্রকল্পে দুর্নীতির কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছে।

কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাতে পুষ্টিকর খাবারের বদলে তুলে দেওয়া হচ্ছে পচা ডিম, দুর্গন্ধযুক্ত দুধ আর মেয়াদোত্তীর্ণ বনরুটি। এতে শিশুদের স্বাস্থ্য ও জীবন এখন চরম ঝুঁকির মুখে। মূলত তদারকির অভাব ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সীমাহীন লোভেই ভেস্তে যেতে বসেছে সরকারের এই মানবিক প্রকল্প।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে শ্রীমঙ্গল উপজেলা ও পৌরসভার ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থী এই কর্মসূচির আওতাভুক্ত।

 নিয়ম অনুযায়ী, সপ্তাহে পাঁচ দিন শিক্ষার্থীদের সিদ্ধ ডিম, ফোর্টিফাইড বিস্কুট, দুধ ও মৌসুমি ফল দেওয়ার কথা। তবে বাস্তবে শ্রীমঙ্গলে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। অভিযোগের তির কুলাউড়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স ইসলাম ট্রেডার্স’-এর দিকে, যারা শুরু থেকেই নি¤œমানের খাদ্য সরবরাহ করে প্রকল্পটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। এমনকি অভিযোগের মুখেও তাদের কার্যক্রমে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি।

গত ১ মে থেকে আশিদ্রোন ইউনিয়নের টিকরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো খাবার পৌঁছায়নি। খুদে শিক্ষার্থীরা টিফিনের সময় ক্ষুধার্ত চোখে তাকিয়ে আছে পাশের দোকানের দিকে।
জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পূরবী রাণী ধর কিছু বনরুটির প্যাকেট দেখিয়ে বলেন, ‘বনরুটির প্যাকেটের ভেতরে মানুষের চুল পাওয়া যাচ্ছে। প্যাকেটের গায়ে কোনো উৎপাদন বা মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ নেই। এগুলো বাচ্চাদের খাওয়ানো মানেই তাদের অসুস্থ করা।’

একই অভিযোগ কালিঘাট ইউনিয়নের ফুলছড়া চা-বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জলি দেবের। তিনি জানান, রুটিন অনুযায়ী বিস্কুট-দুধ বা ডিম-কলা দেওয়ার কথা থাকলেও তাদের শুধু একটি করে আইটেম দেওয়া হচ্ছে। ১৯২ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে খাবার পাঠানো হচ্ছে মাত্র ১৬৫ জনের। এতে বাচ্চাদের মধ্যে খাবার বণ্টন করতে গিয়ে শিক্ষকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক শিশু খাবার না পেয়ে কান্নাকাটি করে বাড়িতে ফিরে যাচ্ছে।

রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র আরও ভয়াবহ। প্রধান শিক্ষক মো. এনামুল কবির জানান, সরবরাহ করা দুধ থেকে প্রায়ই বিকট দুর্গন্ধ আসে এবং ডিমগুলো থাকে অর্ধসিদ্ধ বা পচা। অনেক সময় স্কুল ছুটির পর বিকেলে খাবার পৌঁছায়, যা কোনো কাজে আসে না। ভাড়াউড়া চা-বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহেদা শারমিন বলেন, যেদিন শুধু শুকনো বনরুটি দেওয়া হয়, সেদিন পানি ছাড়া সেগুলো খেতে বাচ্চাদের অনেক কষ্ট হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, শুরুতে খাবার ভালো দিলেও এখন পচা ও গন্ধযুক্ত খাবার দেওয়া হয়। খিদের জ¦ালায় অনেকে খেলেও পরে পেটে ব্যথা বা বমির সমস্যায় ভোগে। এই চিত্র এখন উপজেলার অধিকাংশ বিদ্যালয়ের সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

সচেতন মহল বলছে, শ্রীমঙ্গলের এই চিত্র সারা দেশের স্কুল ফিডিং প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভেঙে শিশুদের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা না গেলে সরকারের এই মহৎ উদ্যোগ কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, আর ক্ষতিগ্রস্ত হবে আগামী প্রজন্ম।
অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার না করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইসলাম ট্রেডার্সের ম্যানেজার সাইফুর রহমান বলেন, ফ্যাক্টরির সমস্যার কারণে এক সপ্তাহ সরবরাহ বন্ধ আছে। কিছু ছোটখাটো সমস্যা থাকতে পারে, আমরা সমাধানের চেষ্টা করছি। তবে কেন দীর্ঘদিন ধরে নিম্মমানের খাবার দেওয়া হচ্ছে, তার কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।

এদিকে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে পরিচালিত এই প্রকল্পে এমন জালিয়াতি দেখে ক্ষুব্ধ স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল। তাদের ভাষ্য, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শিশুদের পুষ্টির টাকা আত্মসাৎ করে তাদের জীবন নিয়ে খেলছে। স্থানীয়রা অবিলম্বে এই দুর্নীতিগ্রস্ত ঠিকাদারের লাইসেন্স বাতিল এবং শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

Leave A Reply

Exit mobile version