নিজস্ব প্রতিবেদক | Info Bangla
বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটের তাণ্ডবে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নেমে এসেছে নজিরবিহীন দুর্যোগ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের জোড়া ধাক্কায় দেশের মূল বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এখন কার্যত দেউলিয়া হওয়ার দোরগোড়ায়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা সরবরাহে টান পড়ার ফলে আমদানিনির্ভর বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদন খরচ লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে। এতে চলতি অর্থবছরে পিডিবির প্রাক্কলিত লোকসান ৪৫ হাজার কোটি টাকা থেকে লাফিয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের সার্বিক অস্থিরতা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া মাশুল দিতে বাধ্য করছে। আন্তর্জাতিক নৌপথে হরমুজ প্রণালি ঘিরে জটিলতা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ব্র্যান্ড ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৬ দশমিক ৬৩ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। জ্বালানির এই আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে গত আগস্ট পর্যন্ত কেবল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকেই (বিপিসি) ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনতে হয়েছে। একই সময়ে চড়া দামে এলএনজি কিনতে গিয়ে গত ছয় মাসে পেট্রোবাংলার ঘাড়েই চেপেছে ১৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকার লোকসান। অর্থাৎ, জ্বালানি খাতের এ দুই সংস্থার মোট লোকসান ৩৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে, যা সেপ্টেম্বর শেষে আরও ভয়াবহ রূপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তেল-গ্যাসের পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতেও হানা দিয়েছে চরম বিপর্যয়। দেশীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ইন্দোনেশিয়া থেকে বার্ষিক দেড় কোটি টন কয়লা আমদানি করা হলেও সেখানে উৎপাদন ২৫ শতাংশ কমে গেছে। এর ওপর আকাশছোঁয়া জাহাজ ভাড়া ও পরিবহন ব্যয়ের যোগফলে প্রতি টন কয়লার দাম ১১০ ডলার থেকে বেড়ে ১৪০ ডলারে পৌঁছেছে। জ্বালানির এ ঘাটতি মেটাতে সরকার গ্যাস ছেড়ে ফার্নেস অয়েলের দিকে ঝুঁকলেও সেখানে প্রতি পদক্ষেপে উৎপাদন খরচ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম ২০ শতাংশ বাড়ানো সত্ত্বেও এ লোকসানের ঘাটতি মেটানো কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, তীব্র অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের তৎপরতায় কোনো ঢিলেঢালা ভাব দেখা যায়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনা ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে ওঠার জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। আন্তর্জাতিক রুটগুলোর স্বাভাবিকতা ফিরে আসলে আগামী দু’সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করছেন নীতি-নির্ধারকেরা। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মধ্যেও শিল্পের চাকা সচল রাখা সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। শীত মৌসুমে পরিকল্পিত লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে কিছুটা অর্থ সাশ্রয়ের পথ সুগম হতে পারে, যা কাটিয়ে উঠতে দেশবাসীকেও আরও সচেতন ও সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

