কক্সবাজার প্রতিনিধি :
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তা এবং শক্তিশালী সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘাত এখন চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে।রাখাইনের মংডু টাউনশিপ ও বুথিডং এলাকায় দুপক্ষের এই তুমুল লড়াইয়ের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশ সীমান্তে।
গত কয়েকদিন ধরে ওপার থেকে ভেসে আসা একের পর এক শক্তিশালী মর্টারশেল ও ভারী বোমার বিকট শব্দে কেঁপে উঠছে টেকনাফের বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকা।
সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের মতে, এবারের বিস্ফোরণগুলোর তীব্রতা আগের চেয়ে অনেক বেশি, যা জনমনে তীব্র আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফ পৌরসভা, নাইট্যংপাড়া, জালিয়াপাড়া, সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ, নাজিরপাড়া, হ্নীলা, জাদিমুড়া, দমদমিয়া এবং হোয়াইকংসহ নাফ নদী সংলগ্ন সীমান্ত এলাকার মানুষ দিন-রাত সমানে বোমাবর্ষণের শব্দ শুনছেন।
“বুধবার রাতে পর পর কয়েকটি শক্তিশালী বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। ঘরবাড়ির জানালা-কপাট পর্যন্ত কাঁপছিল।” এমনটাই বলছিলো স্থানীয় বাসিন্দা নোমান।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বর্ণনা করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি জিয়াউর রহমান বলেন,”বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি যে অনেক সময় একে সাধারণ ভূমিকম্প বলে ভ্রম হয়। বিকট শব্দের পর যখন ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়, তখন বোঝা যায় ওপারে কতটা মারাত্মক যুদ্ধ চলছে।”
একই সুর শোনা গেছে হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলীর কণ্ঠেও। তিনি জানান, প্রায় সাত মাস পর আবারও মিয়ানমারের দিক থেকে এই ধরনের ভারী গোলাবর্ষণের শব্দ আসায় সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষ চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরের ডিসেম্বরে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছিল। পরবর্তীতে আরাকান আর্মি রাখাইনের সিংহভাগের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। তবে দীর্ঘ বিরতির পর হারানো অঞ্চল পুনরুদ্ধার করতে জান্তা বাহিনী এবার সর্বাত্মক কাউন্টার-অফেন্সিভ (পাল্টা আক্রমণ) শুরু করেছে। এমনকি গতকাল সকালে জান্তা সরকার রাখাইনের বুথিডং এলাকায় ভয়াবহ বিমান হামলা (Airstrike) চালিয়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।
মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে একাধিকবার আকাশপথে বোমাবর্ষণ করা হয়, যার প্রতিধ্বনি সীমান্ত পেরিয়ে কাঁপিয়ে দেয় বাংলাদেশকে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনীক চৌধুরী পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করে বলেন: “মিয়ানমারের অভ্যন্তরে তীব্র সংঘর্ষের কারণে বাংলাদেশ সীমান্তে বিকট শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোনো গোলা বা মর্টারশেল এসে পড়ার ঘটনা ঘটেনি।” তিনি স্থানীয় জনসাধারণকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার এবং সীমান্ত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া জানিয়েছেন: “সীমান্ত জুড়ে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে (High Alert) রয়েছে। টহল কার্যক্রম বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। ওপারে জান্তা ও বিদ্রোহীদের লড়াইয়ের জেরে যেন কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশ বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে তৈরি না হতে পারে, সেজন্য বিজিবি সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।”
রাখাইনের এই যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে তা আবারও বাংলাদেশ সীমান্তে নতুন কোনো মানবিক বিপর্যয় বা নিরাপত্তা সংকট তৈরি করবে কিনা— তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

