নিজস্ব প্রতিনিধি :
দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মুক্ত গণমাধ্যমের কফিনে যেন শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের মে মাসটি দেশের সংবাদকর্মীদের জন্য রূপ নিয়েছিল এক চরম নরকরাজ্যে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সারা দেশে সাংবাদিকরা যেভাবে প্রতিনিয়ত বর্বরোচিত শারীরিক হামলা, নৃশংস নির্যাতন, আইনি হয়রানি এবং প্রকাশ্য জীবননাশের হুমকির শিকার হয়েছেন—তা এককথায় অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ।
সংবাদমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরার এই রক্তাক্ত মহোৎসবে মে মাসেই অন্তত ৫৫ জন সংবাদকর্মী নির্মম শিকার হয়েছেন। দেশের মূলধারার গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত সংগঠন বিএজের মাসিক প্রতিবেদন থেকে উঠে এসেছে এক শিউরে ওঠার মতো পরিসংখ্যান।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী মাসে সারা দেশে অন্তত ২১টি পৃথক নারকীয় ঘটনায় ৩৮ জন সংবাদকর্মী সরাসরি নজিরবিহীন শারীরিক হামলা, মধ্যযুগীয় নির্যাতন ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া এই আক্রমণকারীদের তালিকায় রয়েছে—মাদক মাফিয়া, দুর্ধর্ষ কিশোর গ্যাং, রাজনৈতিক দলের উশৃঙ্খল ক্যাডার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশ, প্রভাবশালী ঠিকাদার এবং এমনকি হাসপাতালের কর্মীরাও! যেন চারপাশ থেকে সাংবাদিকদের অবরুদ্ধ করে ফেলার এক হিংস্র প্রতিযোগিতা চলছে।
মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক দলের উশৃঙ্খল নেতাকর্মীরা। পাবনা ও লালমনিরহাটে বিএনপির ক্যাডারদের হাতে ৩ জন সাংবাদিক নৃশংসভাবে আক্রান্ত হয়েছেন। নরসিংদীতে যুবদল নেতার নির্মম মারধরের শিকার হয়েছেন ২ জন সংবাদকর্মী। দাকোপ ও বরিশালে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতার নেতৃত্বে প্রকাশ্য দিবালোকে ১ জন সাংবাদিকের ওপর বর্বর হামলা চালিয়ে তার মোটরসাইকেল গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া বগুড়ায় যুবলীগ এবং কেরানীগঞ্জে রাজনৈতিক সংঘর্ষের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে আরও ২ জন সাংবাদিক রক্তাক্ত ও লাঞ্ছিত হয়েছেন।
যাদের ওপর জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব, সেই পুলিশের ভূমিকাও ছিল স্তম্ভিত করার মতো। চট্টগ্রামে আসামি গ্রেপ্তারের নামে পুলিশের ছোঁড়া গুলিতে ২ জন সাংবাদিক সরাসরি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন! এছাড়া রাজবাড়ীর মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযানের খবর সংগ্রহ করতে গেলে ২ জন সংবাদকর্মীকে পুলিশের বুটের নিচে পিষ্ট ও হামলার শিকার হতে হয়েছে।
অপরাধজগতের সংবাদ প্রকাশ করায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে মদ্যপ সন্ত্রাসীদের হামলায় ২ জন, মানিকগঞ্জে মাদক মাফিয়ার থাবায় ১ জন এবং সাভারে মাদক কারবারিদের আস্তানার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ৪ জন সাংবাদিক গুরুতর জখম হয়েছেন। সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো ঘটনা ঘটেছে ঝালকাঠিতে, যেখানে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত এক সাংবাদিককে প্রকাশ্য রাস্তায় কুপিয়ে রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে।
খোদ আদালতের প্রাঙ্গণে, যেখানে ন্যায়বিচার পাওয়ার কথা, সেখানে চট্টগ্রামে আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আইনজীবীদের কালো কোটের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের হামলায় ৩ জন সাংবাদিক রক্তাক্ত হয়েছেন। ময়মনসিংহে এক প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও তার পালিত গুণ্ডাবাহিনী মিলে ৩ জন সাংবাদিককে পশুর মতো পিটিয়ে জখম করেছে।
বিএজে অত্যন্ত ক্ষোভ ও উদ্বেগের সাথে স্পষ্ট করে জানিয়েছে, সাংবাদিকদের আক্রান্ত হওয়ার এই দীর্ঘ তালিকা কেবল কোনো সংখ্যার হিসাব নয়; এটি দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার টুঁটি চেপে ধরে তা চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক পরিকল্পিত নীল নকশা। যখন রাষ্ট্র ও সমাজ সাংবাদিকদের ন্যূনতম নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই ধসে পড়ে।
বিএজে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, সংবাদকর্মীদের ওপর চলমান এই ধারাবাহিক ও বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় জড়িতদের যদি অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক ও দ্রুত বিচারের আওতায় আনা না হয়, তবে দেশের গণমাধ্যম সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়বে এবং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। সংগঠনটি এই কাপুরুষোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে দোষীদের কঠোরতম শাস্তির দাবি জানাচ্ছে।

