ঢাকা: পাঁচবারের সাবেক সংসদ সদস্য এবং প্রবীণ রাজনীতিবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম রহমতুল্লাহর শেষ বিদায়বেলায় তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বা ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়নি। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে নিয়ম অনুযায়ী স্থানীয় জেলা প্রশাসনকে পূর্বেই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা সত্ত্বেও দাফনের সময় প্রশাসনের কোনো উপস্থিতি ছিল না। একজন স্বীকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধার ক্ষেত্রে এই রাষ্ট্রীয় প্রটোকল লঙ্ঘনের ঘটনাটি বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত বুধবার ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৬ বছর বয়সে মারা যান এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ। ওই দিন বিকেলে তাঁর নিজ এলাকা বেরাইদের মাঠে বিশাল জানাজা শেষে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
মূল কারণ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণবাংলাদেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশের বিশেষ দল এবং জেলা বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার উপস্থিতিতে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান বাধ্যতামূলক। তবে পরিবার সমস্ত নিয়ম মেনে প্রশাসনকে জানানোর পরও এই সম্মাননা না পাওয়ার নেপথ্যে মূলত ৩টি বড় কারণ কাজ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা:রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব: এ কে এম রহমতুল্লাহ আমৃত্যু আওয়ামী লীগের (যার কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ) উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ছিলেন। দেশের বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল বজায় রাখার ব্যাপারে প্রশাসনের ওপর বিশেষ নীতিগত চাপ বা অলিখিত নির্দেশনা থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
প্রশাসনের সচেতন সিদ্ধান্ত ও ঝুঁকি এড়ানো: পরিবার অবগত করার পরও জেলা প্রশাসনের কোনো প্রতিনিধি বা পুলিশ ফোর্স জানাজাস্থলে না আসায় এটি স্পষ্ট যে, এটি কোনো প্রশাসনিক ভুল ছিল না। বরং স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, জনরোষের আশঙ্কা এড়ানো কিংবা বর্তমান সরকারের নীতিগত অবস্থানের সাথে সংঘাত এড়াতে প্রশাসন সচেতনভাবেই এই এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অধিকারের ওপর মেরুকরণের প্রভাব: এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, দেশের বর্তমান তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণের আবহে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে পাওয়া সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় অধিকারের চেয়ে তাঁর ‘দলীয় ও রাজনৈতিক পরিচয়’ বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।স্থানীয় প্রতিক্রিয়াযদিও প্রশাসন এই রাষ্ট্রীয় প্রটোকল থেকে বিরত ছিল, তবে স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর জানাজায় হাজার হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং বেরাইদ স্টেডিয়াম ও বড় মসজিদ মাঠে মাইক সংযোগের মাধ্যমে একযোগে জানাজা পড়া প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের মাঝে তাঁর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যক্তিগত প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য।
পরিবারের পক্ষ থেকে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের পরও জেলা প্রশাসনের এই অনুপস্থিতি বর্তমান বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন, গভীর রাজনৈতিক বিভাজন এবং পরিবর্তিত প্রশাসনিক নীতির একটি বাস্তব চিত্র হিসেবে সামনে এসেছে।

