নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা গত ১৮ মাস বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ইতিহাসে এক চরম অস্থির ও সংকটাপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে শুরু হওয়া এই অরাজকতা ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত দেশের সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামোকে এক গভীর চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সারাদেশে অসংখ্য গণপিটুনি (মব লিঞ্চিং), লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং খুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।বিগত দেড় বছরে সবচেয়ে আলোচিত ও উদ্বেগের বিষয় ছিল ‘মব জাস্টিস’ বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে তুচ্ছ ঘটনায় বা সন্দেহের জেরে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা দেশবাসীকে স্তব্ধ করে দেয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, এই সময়ে সারাদেশে অন্তত ১৮০ থেকে ২০০ জন মানুষ মব ভায়োলেন্সের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনুপস্থিতি বা নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে একদল মানুষ বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ায় সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও ভীতি ছড়িয়ে পড়ে।সরকার পতনের পরবর্তী কয়েক মাস দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক লুটপাট ও ভাঙচুর চালানো হয়।
বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বাড়িঘর, থানা এবং সরকারি স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো এসব হামলায় জানমালের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। অনেক এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও লুটপাটের খবর নিয়মিত শিরোনাম হয়েছে। থানাগুলো থেকে অস্ত্র লুট হওয়ায় অপরাধীদের দাপট বহুগুণ বেড়ে যায়, যা দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দীর্ঘ সময় বেগ পেতে হয়েছে।পুলিশ ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দেড় বছরে খুনের হার আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসেই অন্তত ২৯৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নথিভুক্ত হয়, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া চুরি, ডাকাতি এবং ছিনতাইয়ের ঘটনা শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলেই আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়।
বিশেষ করে মহাসড়কগুলোতে ডাকাতি এবং রাতে পাড়ায় পাড়ায় পাহারার দৃশ্য বিগত দেড় বছরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থাকেই ফুটিয়ে তোলে।আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত বছর যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হলেও জনমনে আস্থা ফেরানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের মনোবলের অভাব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই অপরাধীরা বারবার বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষোভ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ফলশ্রুতিতে এই মব কালচার ডালপালা মেলেছে। আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত না হলে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করা গেলে এই অস্থিরতা পুরোপুরি কাটবে না।

