নিজস্ব প্রতিবেদক: মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘায়িত সংঘাত ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ভয়াবহ অস্থিরতার সরাসরি প্রভাবে গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, তীব্র গ্যাস সংকট এবং সাপ্লাই চেইনে ধসের কারণে শিল্পোৎপাদন থেকে শুরু করে কৃষি ও স্বাস্থ্যখাত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক শিউরে ওঠার মতো চিত্র—এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর চরম ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ের ওই মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালেই বাংলাদেশে নতুন করে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৪ লাখ। চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি না হলে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠার সুযোগ পেতেন। কিন্তু বর্তমান সংকটে সেই সংখ্যা কমে মাত্র ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ, সংঘাতের নির্মম বাস্তবতায় প্রায় ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি পাওয়ার সোনালী সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতে চলেছে।
দেশের মোট প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। অথচ ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় বর্তমানে অভ্যন্তরীণ গ্যাসের উৎপাদন কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। এর ওপর দেশের মোট আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের ৬০-৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫-৬০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ওই অঞ্চলে যুদ্ধ ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে ২৪ থেকে ২৮ ডলারে ঠেকেছে, যা আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির পাঁচটিকে ইতিমধ্যে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, জ্বালানির এই বাড়তি ব্যয় ধাপে ধাপে ভোক্তাদের ঘাড়ে চাপালে মূল্যস্ফীতি আরও শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। পাশাপাশি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা আগের ১.৫ থেকে ২.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকবে। এই বাড়তি ভর্তুকির জোগান দিতে গিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা ও জরুরি খাতের বরাদ্দ ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি কৃষির অবস্থাও শোচনীয়। দেশের ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিই গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম ইতোমধ্যে ৩০ শতাংশ বেড়েছে, আর সংকট না কাটলে তা দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ৪০ শতাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল এমন একটি দেশে সারের এই ধস খাদ্য উৎপাদনকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলবে।
একই সঙ্গে দেশের ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৬ হাজার ২০০টি বেসরকারি হাসপাতালের পরিচালন ব্যয় আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছে। শুধু বড় ৬৪টি সরকারি হাসপাতালের বিদ্যুৎ বিল মেটাতেই মাসে ৬ লাখ থেকে ১১ লাখ ডলার খরচ হচ্ছে। আমদানিনির্ভর কাঁচামাল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়াও দুরূহ হয়ে পড়ছে।
সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কার সত্যতা ইতিমধ্যে মাঠে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। শিল্পকারখানায় নতুন গ্যাসের সংযোগ বন্ধ রয়েছে, কোথাও উৎপাদন সময় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে। এমন বাস্তবতায় নীতিনির্ধারকরা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সামনের দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়তে পারে।
