নিজস্ব প্রতিবেদক | Info Bangla
রাজধানীর এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘোরার পর অবশেষে বিনা চিকিৎসায় প্রাণ গেল মাত্র ছয় মাস বয়সী শিশু আফিয়ার। হামের উপসর্গ নিয়ে টানা দুদিন ঢাকা ও ফরিদপুরের পথ মেপে, পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও জরুরি নিবিড় পরিচর্যার (পিআইসিইউ) অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে শিশুটি। এই ঘটনা দেশের সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থার নাজুক চিত্র এবং জরুরি মুহূর্তে শয্যা সংকটের চরম বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এল।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২৩ জুলাই হামের উপসর্গ নিয়ে ফরিদপুর মেডিক্যালে ভর্তি করা হয় আফিয়াকে। ৭ আগস্ট শুক্রবার রাতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে ঢাকায় আনা হয়। ওই রাতেই পরিবারের সদস্যরা আফিয়াকে নিয়ে একে একে আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতাল এবং মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ছোটেন। কিন্তু কোনো হাসপাতালেই খালি পাওয়া যায়নি পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (পিআইসিইউ) বা ডেডিকেটেড শয্যা। বাধ্য হয়ে চিকিৎসার আশা ছেড়ে ওই রাতেই আবার ফরিদপুরে ফিরিয়ে নেওয়া হয় শিশুটিকে।
পরবর্তী দুই দিন ফরিদপুরে চিকিৎসাধীন থাকার পর রোববার (৯ আগস্ট) রাতে আবারও অবস্থার অবনতি হলে আফিয়াকে দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে আসে তার পরিবার। তবে এবার আর কোনো অক্সিজেন বা পিআইসিইউ শয্যার প্রয়োজন হয়নি; হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা আফিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন। আফিয়ার বাবা, ঢাকার একটি কার্টন কারখানার শ্রমিক মিঠুন শেখ ঢাকা মেডিক্যালের বারান্দায় কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “আজকে টাকার জন্য আমার মেয়েকে বাঁচাতে পারলাম না। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে এক দিনেই ৫০ হাজার থেকে লাখ টাকা লাগে। আমাদের মতো পরিবারের পক্ষে কীভাবে সম্ভব?”
রাজধানীর প্রধান হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও পিআইসিইউ সংকটের চিত্র অত্যন্ত প্রকট। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, ঢামেকে হাম রোগীদের জন্য মাত্র ৩২টির মতো ডেডিকেটেড সিট রয়েছে। অতি সংকটাপন্ন অবস্থায় রোগী এলে তা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, তাদের ৭০০ শয্যার মধ্যে ১০০টি আইসিইউ শয্যার সবগুলোই সার্বক্ষণিক পূর্ণ থাকে। সারা দেশ থেকে আসা রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে এবং বর্তমানে অন্তত দুই হাজার শয্যার সক্ষমতা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত দেশজুড়ে এক লাখ ৩৭ হাজার ৩১২ জন হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছেন। এ সময়ে হাম ও সংশ্লিষ্ট উপসর্গে মোট ৮৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে নিশ্চিত হামেই প্রাণ গেছে ৯৮ জনের। প্রান্তিক পর্যায়ে সঠিক সময়ে আইসিইউ সুবিধা এবং হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য ডেডিকেটেড শয্যা নিশ্চিত করা না গেলে এই মৃত্যুমিছিল ঠেকানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
