কাটাছেঁড়ার দাগকে বুলেটের আঘাত সাজিয়ে মামলা | জমি ও ব্যক্তিগত বিরোধের বলি ঐতিহ্যবাহী দলটির নেতৃত্ব ও তৃণমূল | তদন্তে থলের বিড়াল
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | ঢাকা ১৬ জুলাই ২০২৬
“আমার বাবার জন্মেও এই বাদী বা যে মারা গেছে বলে বলা হচ্ছে, তাদের নাম শুনিনি ভাই। শুধু রাজনৈতিক পরিচয় আর জমিজমা নিয়ে পূর্ব শত্রুতার জেরে ঢাকার মামলায় আমাদের আসামি করা হয়েছে।” — পাবনার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ক্ষোভ ও অশ্রুভেজা কণ্ঠে বলছিলেন এক ভুক্তভোগী।
বাংলাদেশর স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন এবং ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করতে এক ভয়ংকর ও পরিকল্পিত নীলনকশা উন্মোচিত হয়েছে। চব্বিশের জুলাই-আগস্টের অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতাকে পুঁজি করে দলটির বিরুদ্ধে যে ঢালাও হত্যা মামলার হিড়িক পড়েছিল, পুলিশের চূড়ান্ত তদন্তে তার পেছনের অন্ধকার সত্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, রাজনৈতিক আক্রোশ চরিতার্থ করা, নিরীহ মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করা এবং ব্যক্তিগত শত্রুতা উদ্ধারের উদ্দেশ্যে রাজধানী জুড়ে এক শ্রেণির সুবিধাবাদী চক্র সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও ভুয়া মামলার জাল বুনেছে। এমনকি স্বয়ং ‘নিহত’ বা ‘শহীদ’ দাবি করা ব্যক্তি সুদূর প্রবাসে বহাল তবিয়তে কর্মরত আছেন—এমন অবিশ্বাস্য জালিয়াতির প্রমাণও এখন আদালতের টেবিলে।
প্রবাসে ঘাম ঝরাচ্ছেন ‘শহীদ’, মৃত্যুসনদটি ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া!
রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি হত্যা মামলার তদন্তে নেমে পুলিশের চোখ কপালে ওঠার দশা। মামলার এজাহারে দাবি করা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই পুলিশের গুলিতে ৪৬ বছর বয়সী ‘মো. বাবু’ নিহত হয়েছেন। এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে আসামি করা হয়।
কিন্তু হাতিরঝিল থানা পুলিশের গভীর অনুসদ্ধানে জানা যায়, ‘বাবু’ নামের কোনো ব্যক্তি আদতে মারাই যাননি। তার প্রকৃত নাম মো. শাকিল এবং তিনি বর্তমানে সৌদি আরবে দিনমজুর হিসেবে কর্মরত।
সৌদি আরব থেকে হোয়াটসঅ্যাপে এক অডিও বার্তায় আকাশ থেকে পড়ার মতো শোনান শাকিল:
“আমি তো মারা যাইনি ভাই। আমি মরলে সৌদি আরব আসলাম কীভাবে? আমি প্রবাসে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছি, পুলিশও আমার সাথে কথা বলেছে।”
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাসেল ইসলাম জানান, মামলার সাথে সংযুক্ত মৃত্যুসনদটি ছিল সম্পূর্ণ জাল। এমনকি মামলার তথাকথিত বাদী ইসমাইলও আদালতে দাঁড়িয়ে জবানবন্দি দিয়েছেন যে, তিনি এমন কোনো মামলা করেননি; অন্য কেউ তার নাম-পরিচয় চুরি করে এই জালিয়াতি করেছে।
অতীতে পড়ে যাওয়ার দাগকে ‘বুলেটের ক্ষত’ বানানোর নাটক!
আওয়ামী লীগের বলিষ্ঠ নেতৃত্বকে কোণঠাসা করতে জালিয়াতির আরেকটি নিকৃষ্টতম উদাহরণ তৈরি হয়েছে পল্টন থানায়। সেখানে ইয়াসিন আরাফাত নামের এক ব্যক্তি নিজেকে গুলিবিদ্ধ এবং ‘পারভেজ আলী’ নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন দাবি করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসসহ একঝাঁক নেতার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন।
তদন্তভার পাওয়ার পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (PBI) মাঠে নেমে দেখে, পারভেজ আলী নামের কথিত সেই নিহতের বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই। আর বাদী ইয়াসিন আরাফাতের গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবিটি ছিল এক চরম মিথ্যাচার।
তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই মো. মাসুদ রানা জানান:
“তদন্তে দেখা গেছে, কোনো একসময় তার পায়ে আঁচড় লেগে বা পড়ে গিয়ে কাটা-ছেঁড়ার যে দাগ হয়েছিল, সেটিকেই তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে ‘বুলেটের আঘাত’ হিসেবে চালিয়ে দিয়েছেন। এর সপক্ষে কোনো মেডিকেল সনদও তিনি দেখাতে পারেননি।”
স্থানীয়দের মতে, এই মামলার মূল উদ্দেশ্যই ছিল রাজনৈতিক ফায়দা তোলা এবং মামলা বাণিজ্যের মাধ্যমে অনৈতিক অর্থ উপার্জন করা।
তৃণমূলের সাধারণ সমর্থকরাও আক্রোশের শিকার
আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূল শক্তি এর তৃণমূল। এদের মানসিকভাবে ও সামাজিকভাবে ধ্বংস করতে পারিবারিক ও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকেও এই ভুয়া মামলার রাজনৈতিক মোড়ক দেওয়া হয়েছে। পাবনার নিরীহ দুই ট্রাকচালক আব্দুল মতিন ও নাজমুল হাসানকে পল্টনের ওই সাজানো মামলায় আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ আসামিদের মোবাইল কল রেকর্ড (CDR) বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয়েছে, ঘটনার দিন তারা ঢাকা থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে পাবনাতেই অবস্থান করছিলেন। মূলত গ্রামের এক প্রতিবেশীর সাথে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে, সেই প্রতিবেশীর ঢাকার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে এই ভুয়া মামলায় তাদের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।
আইনবিদদের উদ্বেগ: ভাঙছে বিচার ব্যবস্থার মেরুদণ্ড
দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নেতৃত্ব দেওয়া একটি ঐতিহাসিক দলের বিরুদ্ধে এই ‘ভুয়া মামলার রাজনীতি’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের সুধী সমাজ ও আইন বিশেষজ্ঞরা।
সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন:
“অন্যের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে নিরপরাধ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা দণ্ডবিধির ২১১ ধারা অনুযায়ী একটি গুরুতর ও দণ্ডনীয় অপরাধ। এই ভুয়া মামলাগুলো প্রমাণ করে যে শুরু থেকেই একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে ঢালাও অভিযোগ করা হয়েছিল।”
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, এই ভুয়া বাদীদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
আওয়ামী লীগের কোটি কোটি সমর্থক ও দেশের সচেতন মহলের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান ঘটিয়ে অবিলম্বে এসব কাল্পনিক ও ভুয়া মামলা প্রত্যাহার করা হোক এবং দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও জনপ্রিয় দলটির নেতাকর্মীদের ওপর চলমান এই বিচারিক হয়রানি দ্রুত বন্ধ করা হোক।

