নিজস্ব প্রতিবেদক | Info Bangla
টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের ভয়াল থাবায় দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। বন্যা ও পাহাড় ধসের এই জোড়া আঘাতে সাতটি জেলায় এ পর্যন্ত ৫২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। চোখের পলকে বদলে যাওয়া এই পরিস্থিতিতে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ এখন চরম দুর্দিনের মুখোমুখি। শনিবার (১১ জুলাই) সন্ধ্যা পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এই সাত জেলার ৫৮টি উপজেলার ৩৮৬টি ইউনিয়ন ও ১১টি পৌরসভা এখন জলমগ্ন। আকস্মিক এই প্লাবনে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার।
এবারের দুর্যোগে সবচেয়ে ভারী মাশুল গুনতে হয়েছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে। সেখানে পাহাড় ধস ও বন্যাকবলিত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ২৩ জন, যাদের মধ্যে ১০ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিক। এ ছাড়া আহত হয়েছেন আরও ২৪ জন। বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামেও পরিস্থিতি বেশ ভয়াবহ; সেখানে বন্যা ও দেয়াল ধসে ১১ জন নিহত এবং ১২ জন আহত হয়েছেন। পাহাড় ঘেরা বান্দরবানে ঢলের পানিতে ভেসে ও পাহাড় ধসে ৬ জন এবং রাঙ্গামাটিতে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা মৌলভীবাজারে বন্যায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ জন।
মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে সবচেয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। জেলার ১৬টি উপজেলায় আংশিক ও পূর্ণ জলাবদ্ধতার কারণে ৭ লাখ ৫৯ হাজার ৫৩০ জন মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন, যেখানে পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি। দুর্ভোগের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা কক্সবাজারের ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭ জন মানুষ বন্যাকবলিত এবং ৩৯ হাজার ৫০৬টি পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। এ ছাড়া খাগড়াছড়িতে ২৭ হাজার ২২০ জন, মৌলভীবাজারে ৩৮,১৭২ জন, হবিগঞ্জে ২৮,১৪০ জন, বান্দরবানে ৮,৩৫০ জন এবং রাঙ্গামাটিতে ৩,৫২৪ জন মানুষ এই আকস্মিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
হঠাৎ উপচেপড়া পানি আর পাহাড় থেকে নেমে আসা তীব্র ঢলে ঘরবাড়ি হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ এখন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে হন্যে হয়ে ছুটছেন। দুর্গতদের তাৎক্ষণিক আশ্রয় দিতে সরকার ইতোমধ্যে ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করেছে, যেখানে ঠাঁই নিয়েছেন ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন বিপন্ন মানুষ। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু মানুষ এখনো ভিটেমাটির মায়া ছাড়তে না পেরে জলমগ্ন ঘরের চালে কিংবা উঁচু স্থানে অবরুদ্ধ হয়ে আছেন। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের মাঝে এখন শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের তরফ থেকে মানবিক সহায়তা জোরদার করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় গত ৭ জুলাই দেশের ৬৪ জেলার প্রশাসকদের অনুকূলে মোট ৬ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন চাল এবং ৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা নগদ বরাদ্দ দিয়েছে, যার একটি বড় অংশ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাঠানো হয়েছে এই দুর্গত সাত জেলায়। বন্যাকবলিত জেলাগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ৭০০ টন চাল ও ৪০ লাখ টাকা এবং কক্সবাজারে ৪৫০ টন চাল ও ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের প্রতিটিতে ৪০০ টন করে চাল এবং ২০ লাখ করে টাকা দেওয়া হয়েছে। মৌলভীবাজারে ২০০ টন চাল ও ১০ লাখ টাকা এবং হবিগঞ্জে ১০০ টন চাল ও ৫ লাখ টাকা নগদ বরাদ্দ করা হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন শুকনো খাবার, চাল ও নগদ অর্থ বিতরণ শুরু করলেও ভাঙাচোরা সড়ক ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ত্রাণ পৌঁছাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বন্যাকবলিত লাখো মানুষ এখন শুধু পানি কমার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের ত্রাণ কর্মসূচি ও জরুরি সাড়াদান সমন্বয় অধিশাখার যুগ্মসচিব সেখ ফরিদ আহমেদ জানান, বন্যাক্রান্ত জেলাগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং এনজিও কর্মীদের সাথে সমন্বয় করে ত্রাণ ও উদ্ধার কাজ চলছে। জেলা প্রশাসনের চাহিদামতো সব ধরনের বরাদ্দ দিয়ে রাখা হয়েছে এবং মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে এই সংকট উত্তরণে কাজ করে যাচ্ছে।
