নিজস্ব প্রতিবেদক | Info Bangla
দেশে আওয়ামী লীগ ও দলটির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতি প্রচারের ওপর কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকলেও, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক একটি সাক্ষাৎকার বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া তাঁর এই বিশেষ সাক্ষাৎকারটি বিশ্বের অন্তত ২৫টি দেশের ১৩৪টি শীর্ষস্থানীয় মূলধারার সংবাদমাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অভ্যন্তরে আইনি ও প্রশাসনিক বিধিনিষেধের কারণে মূলধারার গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার অবস্থান কিংবা বক্তব্য প্রচারের সুযোগ কার্যত সীমিত হলেও, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও বৈশ্বিক মনোযোগ যে এখনও কতটা প্রবল—এই বিশ্বব্যাপী প্রচার তারই অকাট্য প্রমাণ।
গত ১০ই জুলাই রয়টার্সের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক কৃষ্ণা এন দাসকে দেওয়া প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এক বিশেষ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপের এক বিস্ফোরক ঘোষণা দেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট করে জানান, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি এবং আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা বাংলাদেশে ফিরে সরাসরি আদালতে আত্মসমর্পণ করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করছেন। সাক্ষাৎকারে তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার এমনকি প্রাণনাশের শঙ্কাও রয়েছে। তবে সব ভয়কে উপেক্ষা করে নিজ মাটিতেই যেকোনো ধরণের আইনি বা রাজনৈতিক পরিণতি মেনে নিতে তিনি প্রস্তুত বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর থেকে এটিই শেখ হাসিনার প্রথম কোনো সরাসরি ও দীর্ঘ প্রকাশ্য সাক্ষাৎকার, যেখানে তিনি নিজের প্রত্যাবর্তনের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা স্পষ্ট করলেন।
২০২৫ সালের মে মাসে দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর দেশের অভ্যন্তরে দলটির রাজনৈতিক প্রচার পুরোপুরি থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো শেখ হাসিনার এই সাক্ষাৎকারটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে লুফে নিয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রয়টার্সের মূল প্রতিবেদনটি ছাড়াও যুক্তরাজ্যের বিবিসি বাংলা ও ইয়াহু নিউজ; যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস নিউজ অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট ও এওএল; ইতালির ইন্তারনাজিওনালে; পাকিস্তানের এক্সপ্রেস ট্রিবিউন ও জিও নিউজ; এবং সৌদি আরবের আরব নিউজে খবরটি প্রধান শিরোনাম হিসেবে স্থান পেয়েছে।
দেশভিত্তিক প্রচারের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সংবাদমাধ্যমে। দেশটির টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি, হিন্দুস্তান টাইমস ও জি নিউজসহ মোট ৭৮টি গণমাধ্যম, যা মোট তালিকার প্রায় ৫৮ শতাংশ, এই সংবাদটি প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ১০টি এবং যুক্তরাজ্যে ৬টি সংবাদমাধ্যম খবরটি প্রচার করেছে। পাশাপাশি পাকিস্তান (৬টি), মালয়েশিয়া (৪টি), সিঙ্গাপুর (৩টি) ছাড়াও ইতালি, শ্রীলঙ্কা, জার্মানি, কাতার, রাশিয়া, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ প্রায় ১৯টি দেশের সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদনটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এর বিপরীতে, বাংলাদেশের মাত্র দুটি সংবাদমাধ্যম (বিজনেস টাইমস বিডি ও আগামীর সময়) এই সংকলিত তালিকায় জায়গা পেয়েছে, যা দেশের ভেতরের সতর্ক ও নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম পরিস্থিতির স্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আরও উল্লেখ করেন যে, ঢাকার পক্ষ থেকে তাঁকে ফেরত পাঠাতে বারবার ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানো হলেও তিনি নিজের আইনি লড়াইয়ের সিদ্ধান্তে অটল আছেন। এ বিষয়ে তিনি অন্য কোনো বিদেশি সরকারের সাথে কোনো প্রকার আলোচনা বা পরামর্শ করেননি বলে সাফ জানিয়ে দেন। উল্লেখ্য, এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া দেয়নি। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন আন্দোলনের মুখে দেশত্যাগের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁর অনুপস্থিতিতে রায় ঘোষণা করে। তবে বর্তমান চরম রাজনৈতিক জটিলতা ও আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ের মুখেও শেখ হাসিনার এই সরাসরি ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দেশে ফেরার ঘোষণা আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে যেমন নতুন করে রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে, ঠিক তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চলমান অন্তর্বর্তীকালীন পরিস্থিতিকে আবারও তীব্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
