ঢাকা, ৫ জুলাই ২০২৬: জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার ও বাস্তুচ্যুত অসহায় মানুষের পুনর্বাসনের নামে সরকারি অর্থে এক অভিনব ‘বিলাসিতা’র আয়োজন করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। ৩০০ জন দরিদ্র মানুষের ভাগ্য বদলের জন্য ৮ কোটি ১০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়ার বিপরীতে, সেই টাকা বিতরণের ব্যবস্থাপনা ও পরামর্শক ফির পেছনেই খরচ ধরা হয়েছে ৫৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা!

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস্তুহারা ও প্রান্তিক মানুষের সহায়তার দোহাই দিয়ে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থই সুকৌশলে আমলা ও পরামর্শকদের পকেটে ভরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আজ রোববার পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এই বিতর্কিত প্রকল্প প্রস্তাবটি চুলচেরা বিশ্লেষণের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।

গরিবের ভাগে মাত্র ১৩%, বাকিটা ‘অন্যদের’ পকেটে

‘অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নগর একীভূতকরণ সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাগতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা প্রদান (ইন্টিগ্রেট)’ শীর্ষক এই প্রকল্পের মোট বাজেট ধরা হয়েছে ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। জার্মান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জিআইজেড) অর্থায়নে ১ বছর ৯ মাস মেয়াদি এই প্রকল্পের বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়:

  • সরাসরি অনুদান (প্রান্তিক মানুষের জন্য): ৮ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার টাকা (মোট বাজেটের মাত্র ১৩.২৩%)।
  • ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক খরচ: ৫৩ কোটি ১৮ লাখ ৭৪ হাজার টাকা (মোট বাজেটের প্রায় ৮৬.৭৭%)।

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জের মাত্র ৩০০ জন দরিদ্র মানুষের (যার মধ্যে ২৭০ জন নারী ও ৩০ জন প্রতিবন্ধী) ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ তৈরি করা হবে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই ৩০০ জন মানুষের অনুদান নিশ্চিত করতে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে ৪৭৩ জন দেশি-বিদেশি পরামর্শক!

এই পরামর্শকদের পেছনেই ব্যয় হবে ২৯ কোটি ৬২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা, যা মোট প্রকল্পের প্রায় ৪৮.৩৩%। অর্থাৎ, বাস্তুচ্যুতদের মূল সহায়তার চেয়ে পরামর্শকদের পকেট ভারী করতেই খরচ হচ্ছে প্রায় চার গুণ বেশি টাকা।

সরকারের পক্ষ থেকে কৃচ্ছ্রসাধন এবং বৈদেশিক ভ্রমণে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এই প্রকল্পে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের ‘সাধ’ মেটাতে বিপুল অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

  • বৈদেশিক ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণ: ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
  • অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ: ১ কোটি ২৭ লাখ Crete টাকা।
  • অফিস ভবন ভাড়া: ৩ কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
  • ব্যবস্থাপনা চার্জ: ১০ কোটি ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।

এছাড়াও আইটি সামগ্রী ও টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রেও বাজারদরের চেয়ে অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য ধরা হয়েছে বলে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে।

প্রকল্পটির উদ্দেশ্য খাগড়াছড়ি বা উত্তরাঞ্চলের মতো পিছিয়ে পড়া এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়ন বলা হলেও, প্রকৃত সুবিধাভোগী বাছাইয়ের কোনো স্বচ্ছ রূপরেখা প্রস্তাবনায় দেওয়া হয়নি। এছাড়া সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ-২০০৬) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০০৮) যথাযথভাবে অনুসরণ না করারও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি প্রকল্পের মেয়াদের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে পার হয়ে যাওয়ায় এর বাস্তবায়ন নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ব্যয়ের এই অস্বাভাবিকতা ও অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা) মো. সাজ্জাদুল ইসলাম জানান, এই প্রকল্প প্রস্তাবনা তারা নিজেরা তৈরি করেননি, বরং দাতা সংস্থা (জিআইজেড) এটি তৈরি করে পাঠিয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে হওয়া এই কারিগরি সহায়তা প্রকল্পে দাতা সংস্থার শর্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকে না বলে দাবি করেন তিনি।

সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি বলেন, “এটি কেবল প্রস্তাবনায় দেওয়া হয়েছে। সরকার অনুমতি দিলেই কেবল ভ্রমণ হবে, অন্যথায় এই খাতের টাকা খরচ না হয়ে পড়ে থাকবে।”

পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, পিইসি সভায় এই প্রকল্পের উচ্চ পরামর্শক ব্যয় এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক খরচের বিষয়ে জবাবদিহি চাওয়া হবে। যেসব খাতে অবাস্তব ব্যয় ধরা হয়েছে, সেগুলো কঠোরভাবে কাটছাঁট করার নির্দেশ দেওয়া হবে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অজুহাতে নেওয়া এই ধরনের প্রকল্প যদি আমলাতান্ত্রিক খরচেই শেষ হয়ে যায়, তবে প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না। এই ব্যয় কাঠামো সংশোধন না করলে এটি কেবল রাষ্ট্রীয় ও বৈদেশিক অর্থের চরম অপচয় হিসেবেই গণ্য হবে।

Leave A Reply

যোগাযোগ
ইমেইল: contact@infobangla.news
ওয়েবসাইট: InfoBangla.news

© ২০২৬ InfoBangla.news — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
InfoBangla.news এ প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, ভিডিও বা যেকোনো কনটেন্ট পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার, পুনঃপ্রকাশ বা বিতরণ আইনত দণ্ডনীয়।

Exit mobile version