নিজস্ব প্রতিনিধি :
দেশের চলমান অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়েও চড়া দামে গম আমদানির এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাজারদরের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্যে আরও ২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন গম আমদানির প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সাথে সিঙ্গাপুর থেকেও আমদানি করা হচ্ছে আরও ৫০ হাজার মেট্রিক টন গম।
গত বুধবার (১ জুলাই) সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের দুটি পৃথক প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এই আমদানিতে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে সরকারের মোট ব্যয় হবে ১ হাজার ৫২ কোটি ৪০ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। জনগণের করের টাকার এই বিশাল অঙ্কের ব্যয় এখন তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
নীতিগত ও কৌশলগত ব্যর্থতার মূল ক্ষেত্রসমূহ
উন্মুক্ত বিশ্ববাজারে যেখানে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে গম কেনার একাধিক বিকল্প উৎস সচল রয়েছে, সেখানে অতিরিক্ত দাম দিয়ে মার্কিন গম কেনাকে সরকারের চরম অর্থনৈতিক অদূরদর্শিতা ও দরকষাকষির ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
রাশিয়া, ইউক্রেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, রোমানিয়া ও আর্জেন্টিনার মতো দেশগুলো থেকে যেখানে বাজারদর ও মান বিবেচনা করে সাশ্রয়ী মূল্যে গম সংগ্রহের নিয়মিত সুযোগ রয়েছে, সেখানে সেই সুযোগ ব্যবহারে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। বিকল্প সস্তা উৎসগুলো সচল রাখতে না পারাই এই চড়া মূল্যের ফাঁদে পড়ার প্রধান কারণ।
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি যখন ডলার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটে জর্জরিত, তখন প্রতিটি ডলার সাশ্রয় করা যেখানে প্রধান দায়িত্ব ছিল, সেখানে আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে বেশি মূল্যে জি-টু-জি (সরকার-টু-সরকার) চুক্তির নামে কোটি কোটি ডলারের অতিরিক্ত অপচয় সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে।
এর আগে চার দফায় ধারাবাহিকভাবে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি গম (যথাক্রমে ৫৬,৯৫৯ টন, ৬০,৮০২ টন, ৬০,৮৭৫ টন এবং ৬০,৯৫০ টন) এই একই প্রক্রিয়ায় উচ্চমূল্যে আনা হয়েছে। ধারাবাহিক এই আমদানিতেও কেন দেশের স্বার্থে দাম পুনর্নির্ধারণ বা সাশ্রয়ী চুক্তি নিশ্চিত করা গেল না, তা সরকারের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক ব্যর্থতার স্পষ্ট প্রমাণ।
দেশের বাজারে সাধারণ মানুষ যখন তীব্র মূল্যস্ফীতি আর খাদ্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে দিশেহারা, তখন সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে বেশি মূল্যে পণ্য কেনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। উন্মুক্ত দরপত্রের সুস্থ প্রতিযোগিতাকে পাশ কাটিয়ে কিংবা দরকষাকষিতে পিছিয়ে থেকে এই ধরনের উচ্চব্যয়ী চুক্তি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করছে—যা সরাসরি সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে।

