নিজস্ব প্রতিনিধি :

সব ধরনের দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র এবং আর্থিক ও কারিগরি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের যে সাহসী সিদ্ধান্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিয়েছিলেন, তা আজ দেশের অর্থনীতির জন্য এক অনন্য আশীর্বাদ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। উদ্বোধনের মাত্র চার বছর পূর্ণ হওয়ার মুখেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের স্বপ্নের এই মেগা প্রকল্প এখন বড় ধরনের লাভের পথে হাঁটছে।

২০২২ সালের ২৬ জুন যান চলাচল শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৬ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত সেতুটির টোল থেকে মোট আয় হয়েছে ৩ হাজার ৩৯২ কোটি ১৬ লাখ টাকারও বেশি। এই চার বছরে আড়াই কোটিরও বেশি যানবাহন সেতুটি ব্যবহার করেছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক গতি সঞ্চার করেছে।

শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা: ৩৫ বছরের খরচ উঠছে ২২ বছরেই পদ্মাসেতু নির্মাণের সময় সরকারের প্রাথমিক সমীক্ষায় প্রাক্কলন করা হয়েছিল যে, সেতুর সম্পূর্ণ নির্মাণ ব্যয় তুলে আনতে অন্তত ৩৫ বছর সময় লাগবে। তবে শেখ হাসিনার দূরদর্শী উন্নয়ন দর্শনের কারণে চালুর পর থেকেই যানবাহন চলাচল ও টোল আদায়ের পরিমাণ ধারণাতীতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সেতু কর্তৃপক্ষের বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, যেভাবে টোল আদায় চলছে তাতে সম্পূর্ণ খরচ উঠতে আর সর্বোচ্চ ১৮ বছর লাগবে। অর্থাৎ, ২০৪৫ সালের মধ্যেই উঠে আসবে মেগা প্রকল্পটির সম্পূর্ণ নির্মাণ ব্যয়। ২০২২ সালের জুনে উদ্বোধনের পর থেকে হিসাব করলে মাত্র ২২ বছরেই উঠে যাবে এই বিশাল যজ্ঞের পুরো টাকা, যা প্রাক্কলিত সময়ের চেয়ে ১৩ বছর কম!

চার বছরের বছরভিত্তিক টোল আদায়ের চিত্র:
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বাসেক) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছরই পদ্মা সেতু থেকে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হচ্ছে:
২০২২ (জুন-ডিসেম্বর): ৪মেগা প্রকল্পের শুরুর মাত্র ৬ মাসে ২৭ লাখ ৯০ হাজার ৪৬৫টি যানবাহন থেকে আয় হয় ৪০২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা
২০২৩: পুরো বছরে টোল আদায় দাঁড়ায় ৮১৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা
২০২৪: আদায়ের পরিমাণ আরও বেড়ে হয় ৮৩৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা
২০২৫: টোল আদায়ের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী রেখে আয় হয় ৮৮৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা
২০২৬ (২৩ জুন পর্যন্ত): চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই আদায় হয়েছে ৪৪৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা

একদিনে সাড়ে ৫ কোটি টাকা আদায়ের ঐতিহাসিক রেকর্ড: > চলতি বছরের ঈদুল আজহা উপলক্ষে গত ৫ জুম ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ৫২ হাজার ৪৮৭টি যানবাহন সেতুটি ব্যবহার করে। ওই একদিনেই টোল আদায় হয়েছে ঐতিহাসিক ৫ কোটি ৪৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা

ঋণ পরিশোধ ও সরকারের লাভ পদ্মা সেতু প্রকল্পটি সরকারের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ অর্থ বিভাগের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে নির্মাণ করেছিল। ৩২ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে সরকারের দেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা। প্রতি কিস্তিতে গড়ে ১৫৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা করে পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

২০২৩ সালের ৫ এপ্রিল থেকে ঋণ পরিশোধের প্রক্রিয়া শুরু করে এ পর্যন্ত মাত্র তিন বছরেই ১৬টি কিস্তিতে মোট ২,৫২৩ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ। ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি মোট টোল আদায়ের ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাবদ আরও ৫০৮ কোটি টাকা সরকারি রাজস্বে জমা দেওয়া হয়েছে। বাকি টাকা ব্যয় হচ্ছে সেতুর উচ্চ প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক মানের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন কাজে।

বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর পর এটিই হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের দ্বিতীয় কোনো প্রকল্প, যা দ্রুততম সময়ে ‘ব্রেক-ইভেন’ (Break-even) বা লাভজনক অবস্থায় পৌঁছাচ্ছে।

পদ্মাসেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়েদ জানান, টোল আদায়ের পরিমাণ আমাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক বেশি। তবে সেতু কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) আলতাফ হোসেন শেখ গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন, নিয়মিত ঋণ ও ভ্যাট পরিশোধ করেও যে গতিতে টোল আদায় বাড়ছে, তাতে আমরা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক আগেই লাভের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে যাব।

অর্থনীতিবিদদের মতে, পদ্মা সেতুর এই অবিশ্বাস্য আর্থিক সাফল্য প্রমাণ করে যে শেখ হাসিনার একক সাহসী সিদ্ধান্তটি কতটা বাস্তবসম্মত ও যুগোপযোগী ছিল। আর্থিক লাভের খতিয়ান ছাপিয়েও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের যাতায়াতের ভোগান্তি অবসান এবং এই অঞ্চলের শিল্পায়ন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে যেভাবে এই সেতু জাগিয়ে তুলেছে, তা সত্যিই বাংলাদেশের জন্য এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক আশীর্বাদ বা ‘ম্যাজিক বুলেট’।

Leave A Reply

যোগাযোগ
ইমেইল: contact@infobangla.news
ওয়েবসাইট: InfoBangla.news

© ২০২৬ InfoBangla.news — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
InfoBangla.news এ প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, ভিডিও বা যেকোনো কনটেন্ট পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার, পুনঃপ্রকাশ বা বিতরণ আইনত দণ্ডনীয়।

Exit mobile version