অনলাইন ডেস্ক :
দেশে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। গত ছয় মাসে সারা দেশে অন্তত ১৬৪টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ২৪টি ঘটনায় ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে ভুক্তভোগীকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক অবক্ষয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের ফলেই এই অপরাধগুলো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, রাস্তাঘাট বা অজানা পরিবেশের চেয়েও শিশুরা বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে তাদের চেনা ও পরিচিত পরিবেশে।
📊 এক নজরে মূল পরিসংখ্যান,
মোট ভুক্তভোগী, ১৬৪ শিশু (১৫৬টি ঘটনায়),
ধর্ষণের পর হত্যা, ২৪ জন (যার সিংহভাগেরই বয়স ৯ বছরের নিচে)।
বলাৎকারের শিকার, ৪৩ জন ছেলেশিশু,সবচেয়ে ঝুঁকিতে ১০ বছরের নিচে ১১৭ জন শিশু (৭১%)।
লিঙ্গভিত্তিক তথ্য: কন্যাশিশু ৮৭ জন (৫৩%), ছেলেশিশু ৪৩ জন (২৬%), এবং অজ্ঞাত ৩৪ জন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শিশুদের সুরক্ষার জন্য এখন ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা পাড়া-মহল্লা—কোনোটিই আর সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। অপরাধীদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক ভয়ানক চিত্র: পরিচিতজনদের সংশ্লিষ্টতা (৪৪%) মোট ৭৬টি ঘটনায় পরিবার, আত্মীয়, প্রতিবেশী বা শিক্ষকরা জড়িত।
এর মধ্যে নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীর নাম এসেছে ৩৬টি ঘটনায় (২৩%) এবং স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষক ও ইমামদের নাম এসেছে ৩২টি ঘটনায় (২১%) অপরিচিতদের সংশ্লিষ্টতা (৫৬%) ৮৮টি ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা শিশু বা তার পরিবারের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল।
ধর্ষণের পর যে ২৪টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে, তার দুই-তৃতীয়াংশ (১৬টি) ঘটিয়েছে অপরিচিতরা। বাকি ৮টি ঘটনায় সৎবাবা, দুলাভাই বা পরিবারের অন্য সদস্যরা জড়িত ছিল।
📈 মাসভিত্তিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা (গ্রাফিকস ডাটা)
পরিসংখ্যান বলছে, বছরের প্রথমদিকের তুলনায় এপ্রিল ও মে মাসে এসে অপরাধের গ্রাফটি জ্যামিতিক হারে ওপরের দিকে উঠেছে।
| মাস | ভুক্তভোগী শিশুর সংখ্যা | ডিসেম্বর (২০২৫) এ ১৯ জন, জানুয়ারি (২০২৬) এ ১৭ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৩ জন, মার্চে ১৮ জন এপ্রিলে ৪২ জন,মে মাসে ৫৫ জন (সর্বোচ্চ)।
বি.দ্র.: ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ৪ মাসে যেখানে মোট ৬৭ জন শিশু ভুক্তভোগী ছিল, সেখানে শুধু মে মাসেই সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫ জনে।
বিভাগীয় শীর্ষ
শিশু ধর্ষণের ঘটনায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বিভাগ (৪৯টি)। দ্বিতীয় অবস্থানে চট্টগ্রাম বিভাগ (৩৭টি) এবং তৃতীয় স্থানে রাজশাহী (২০টি)। এছাড়া সবচেয়ে কম ঘটনা ঘটেছে সিলেটে (৫টি)।
জেলা ভিত্তিক শীর্ষে
জেলা হিসেবে এককভাবে শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা (১২টি)। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কুমিল্লা (৮টি) এবং যৌথভাবে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ (৭টি করে)।
ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বলাৎকারের চিত্র
গত ছয় মাসে দেশে ৪৩টি বলাৎকারের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি ঘটনার ক্ষেত্রেই (৬০%) মাদ্রাসা শিক্ষক বা মসজিদের ইমামদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ৫টি এবং সম্পূর্ণ অপরিচিতদের বিরুদ্ধে ১২টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এটি ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বিশ্বাসের সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
এ বিষয়ে ঢাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড.ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, “এই বিকৃত মানসিকতার অপরাধের শিকার হয়ে শিশুরা মানসিকভাবে চরম ট্রমার মধ্য দিয়ে যায়। মানুষের ওপর থেকে তাদের বিশ্বাস উঠে যায়, যা তাদের সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে বড় হতে বাধা দেয়। দীর্ঘমেয়াদে এই তিক্ত অভিজ্ঞতা তাদের পরবর্তী জীবনের দাম্পত্য বা স্বাভাবিক শারীরিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই অপরাধ থামাতে কঠোর আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাবা-মাকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।”
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফাওজিয়া মোসলেম বলেন, “আমাদের সমাজ ক্রমান্বয়ে হিংস্র হয়ে উঠছে। এখানে ক্ষমতার দাপটের কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই অপরাধীরা বারবার একই অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে। আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচারের দৃষ্টান্ত তৈরি করতে না পারলে এই ভয়াবহতা কমানো সম্ভব নয়।”
