নিজস্ব প্রতিবেদক, কলাপাড়া:

সংসদ সদস্যদের (এমপি) বার্ষিক ঐচ্ছিক তহবিলের টাকা মূলত নির্বাচনী এলাকার প্রতিবন্ধী, বন্যা কবলিত, দুস্থ, অসুস্থ ও অসহায় মানুষের সহায়তার জন্য সরকার বরাদ্দ দিয়ে থাকে। এই অর্থ বিতরণের সুনির্দিষ্ট সরকারি নীতিমালা থাকলেও পটুয়াখালী-৪ আসনে তা চরমভাবে উপেক্ষিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। 

নীতি ও নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে প্রকৃত অসহায়দের বাদ দিয়ে দলের স্বচ্ছল ও প্রভাবশালী নেতাদের মাঝে এই খয়রাতির অর্থ বিতরণ করা হয়েছে বলে স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পটুয়াখালী-৪ আসনের এমপির ঐচ্ছিক বরাদ্দ থেকে কলাপাড়া উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি মিজানুর রহমান টুটু বিশ্বাস এবং পৌর শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক শোয়েবসহ দলের একাধিক স্বচ্ছল নেতার মাঝে এই অনুদানের টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি মিজানুর রহমান টুটু বিশ্বাসের পারিবারিক ঐতিহ্য রয়েছে এবং তার তিন ছেলেই সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত। বিশেষ করে তার বড় ছেলে লিটু একজন কোটিপতি ব্যবসায়ী এবং তিনি নিজেই নিয়মিত বিপুল অংকের অর্থ দান-খয়রাত করে থাকেন।

সম্প্রতি টুটু বিশ্বাসের হাত পেতে সরকারি অনুদানের ‘খাম’ নেওয়ার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। 

একজন সুপ্রতিষ্ঠিত ও স্বচ্ছল রাজনৈতিক নেতার এভাবে দুস্থদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ গ্রহণের ছবি দেখে খোদ দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই মন্তব্য করছেন, যাদের সন্তানরা কোটিপতি, তাদের এভাবে দুস্থদের টাকা নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।

অন্যদিকে, পৌর শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক শোয়েব—যিনি আগামী পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে ব্যানার-ফেস্টুন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেকে ব্যাপক জনপ্রিয় দাবি করে প্রচারণা চালাচ্ছেন, তাকেও এই তহবিলের অর্থ দেওয়া হয়েছে।

 স্থানীয় সচেতন মহল প্রশ্ন তুলেছেন, যিনি নিজের খরচে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর মতো স্বচ্ছল এবং পৌর মেয়র হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, তিনি কীভাবে দরিদ্র মানুষের হক বা অনুদানের টাকা গ্রহণ করেন? যিনি সামান্য সরকারি অনুদানের লোভ সামলাতে পারেন না, তিনি মেয়র হলে জনগণের আমানত কীভাবে রক্ষা করবেন?

দলের এমন প্রভাবশালী ও স্বচ্ছল নেতাদের মাঝে যখন সরকারি অনুদান বিতরণ করা হচ্ছে, তখন অন্য চিত্র দেখা গেছে মাঠপর্যায়ের ত্যাগী ও অসুস্থ নেতাদের ক্ষেত্রে। 

জানা গেছে, কলাপাড়া উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক জাকির হোসেন বাদল মৃধাসহ মাঠপর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ টাকার অভাবে সুচিকিৎসা করাতে পারছেন না। প্রকৃত অসহায় ও চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষদের বাদ দিয়ে বিত্তবান নেতাদের পকেটে দুস্থদের টাকা যাওয়ার এই ঘটনাকে স্থানীয়রা ‘আজব ও কলঙ্কিত রাজনীতি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা তাদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় সমাজসেবামূলক ও আপৎকালীন কাজের জন্য প্রতি অর্থবছর সরকার থেকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা ঐচ্ছিক তহবিল (Discretionary Fund) পেয়ে থাকেন। এই তহবিলের অর্থ সম্পূর্ণ আয়করমুক্ত।

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্য কেবল নিম্নলিখিত নির্দিষ্ট খাতগুলোতেই এই অর্থ অনুমোদন বা বিতরণ করতে পারেন:

দুস্থ ও অসহায়দের চিকিৎসা: নির্বাচনী এলাকার কোনো দরিদ্র মানুষ মারাত্মক অসুস্থ হলে তার চিকিৎসার খরচ বা ওষুধ কেনার জন্য।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়তা: বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন বা অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জরুরি পুনর্বাসন ও ত্রাণের জন্য।

দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা: অর্থাভাবে পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে এমন মেধাবী ও দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের বই খাতা কেনা বা পরীক্ষার ফি দেওয়ার জন্য।

প্রতিবন্ধী ও দুস্থ পুনর্বাসন: শারীরিক প্রতিবন্ধী, বিধবা, এতিম কিংবা চরম অর্থকষ্টে থাকা অসহায় মানুষের আত্মকর্মসংস্থান বা তাৎক্ষণিক জীবনধারণের সহায়তার জন্য।

ছোটখাটো সামাজিক উন্নয়ন: স্থানীয় পর্যায়ের কোনো ছোট সামাজিক বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জরুরি সংস্কার কাজে (যেমন: ক্লাব, মসজিদ, মন্দির বা পাঠাগারের ক্ষুদ্র মেরামত)।

নীতিমালার মূল শর্ত: এই তহবিলের অর্থ বিতরণের ক্ষেত্রে গ্রহীতাকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা এবং প্রকৃত অর্থে দরিদ্র, দুস্থ বা অসহায় হতে হবে। কোনো স্বচ্ছল, বিত্তবান বা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী ব্যক্তি এই তহবিলের অর্থ পাওয়ার যোগ্য নন।

Leave A Reply

যোগাযোগ
ইমেইল: contact@infobangla.news
ওয়েবসাইট: InfoBangla.news

© ২০২৬ InfoBangla.news — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
InfoBangla.news এ প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, ভিডিও বা যেকোনো কনটেন্ট পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার, পুনঃপ্রকাশ বা বিতরণ আইনত দণ্ডনীয়।

Exit mobile version