নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী :

১৫ জুন, ২০২৬

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) ভর্তি থাকা শিশুদের নিয়ে এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। সাধারণ রোগব্যাধি সারাতে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকগুলো এখন শিশুদের শরীরে আর কোনো কাজ করছে না। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, প্রাণরক্ষাকারী এই ওষুধগুলো এখন মানবদেহে কেবল ‘পানি’ বা ‘চকের গুঁড়োর’ মতো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।

চলতি বছরের প্রথম চার মাসে রামেক হাসপাতালের পিআইসিইউতে ভর্তি থাকা শিশুদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় এই ভয়ঙ্কর চিত্র ধরা পড়েছে। গবেষণাটির নেতৃত্বে ছিলেন শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন শিশুদের শরীরে অন্তত ৯৬ ভাগ অ্যান্টিবায়োটিক সম্পূর্ণ কার্যকারিতা হারিয়েছে (রেজিস্ট্যান্স হয়ে গেছে)। ফলে অতীতে যে রোগ বা সংক্রমণ সারতে মাত্র ৬ দিন সময় লাগত, তা এখন দ্বিগুণ সময়েও নিরাময় হচ্ছে না। এতে একদিকে যেমন শিশুদের প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে দীর্ঘায়িত হচ্ছে হাসপাতালের ভোগান্তি ও চিকিৎসার খরচ।

গবেষক ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, বছরের শুরুতেই পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক ছিল, যা প্রতিনিয়ত আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে। পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন:

 জানুয়ারি–মার্চ বছরের প্রথম তিন মাসে বহুল ব্যবহৃত ও প্রথম সারির (ফার্স্ট লাইন) ৬টি অ্যান্টিবায়োটিকের গড় রেজিস্ট্যান্সের হার ছিল ৮৩.৮ শতাংশ। এপ্রিলে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে এপ্রিল মাসে এসে এই ৬টি ওষুধের রেজিস্ট্যান্সের হার এক লাফে ১০০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে!

চিকিৎসকদের মতে, এপ্রিল মাসের এই পরিসংখ্যানটি পুরো হাসপাতাল তথা দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার জন্য একটি বড় ধরনের বিপদের সংকেত।

ভরসা কেবল দুটি ওষুধে, তাও শেষের পথে

গবেষণায় দেখা গেছে, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা এই শিশুদের বাঁচাতে বর্তমানে কেবল টাইজেসাইক্লিন (Tigecycline) ও কলিস্টিন (Colistin) নামের দুটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর রয়েছে।

তবে চিকিৎসকরা চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, যেভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার হচ্ছে, তাতে ‘কলিস্টিন’ ওষুধটিও খুব দ্রুতই তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলতে পারে। যদি এমনটা ঘটে, তবে সাধারণ সংক্রমণেও শিশুদের বাঁচানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিক সেবন, কোর্স সম্পূর্ণ না করা এবং পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণেই জীবাণুরা এই ওষুধগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছে (Superbugs)।

 “এটি কোনো সাধারণ সতর্কবার্তা নয়, এটি একটি নীরব মহামারি। এখনই যদি অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে কঠোর আইন ও সচেতনতা তৈরি করা না যায়, তবে আগামী দিনে সামান্য অসুখেই কোটি কোটি শিশুর প্রাণহানি ঘটবে।”

রামেক হাসপাতালের এই গবেষণাটি দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি ‘ওয়েক-আপ কল’ বা চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। চিকিৎসকরা অনতিবিলম্বে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ এবং এ বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

Leave A Reply

যোগাযোগ
ইমেইল: contact@infobangla.news
ওয়েবসাইট: InfoBangla.news

© ২০২৬ InfoBangla.news — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
InfoBangla.news এ প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, ভিডিও বা যেকোনো কনটেন্ট পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার, পুনঃপ্রকাশ বা বিতরণ আইনত দণ্ডনীয়।

Exit mobile version