নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র, সাবেক সফল মন্ত্রী এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক তোফায়েল আহমেদ আর নেই।
সোমবার (১ জুন) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না লিল্লাহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত ও প্যারালাইজডসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এই প্রবীণ নেতা। তাঁর চলে যাওয়ার খবরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তিনি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম এবং একমাত্র কন্যা ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নীসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক ছিলেন তিনি। তৎকালীন ডাকসুর ভিপি এবং সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্বেই ছাত্র-জনতা তৎকালীন পাকিস্তান সরকারকে বাধ্য করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে।
মুক্তির পরদিন, ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার উপচে পড়া ভিড়ে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে পরম শ্রদ্ধায় ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন তরুণ তুর্কী তোফায়েল আহমেদ। যা পরবর্তীতে বাঙালির হৃদয়ের স্পন্দন ও ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে এমএসসি সম্পন্ন করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) এবং পরবর্তীতে ডাকসুর ভিপি হিসেবে ছাত্ররাজনীতিতে পদাঙ্ক রেখেই তিনি জাতীয় রাজনীতির মূল ধারায় চলে আসেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান ছিল অনন্য। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চালিকাশক্তি ‘মুজিব বাহিনী’র (বিএলএফ) অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন ছিলেন। মাঠপর্যায়ে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে তিনি স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব পান। এরপর তিনি নিজের জেলা ভোলা থেকে টানা ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, যা তাঁর তুমুল জনপ্রিয়তার প্রমাণ বহন করে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে সফলভাবে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলান তিনি। দেশের বাণিজ্য খাত সম্প্রসারণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে তিনি দূরদর্শী ভূমিকা রেখেছিলেন।
রাজনীতির জন্য জীবনের সোনালী সময় উৎসর্গ করেছেন এই কর্মবীর। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর থেকে শুরু করে জীবনের বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৩৩ মাস কারাবরণ করতে হয়েছে তাঁকে। নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে তিনি আজীবন ছিলেন আপসহীন।
এক শান্ত, প্রাজ্ঞ এবং দক্ষ অভিভাবককে হারিয়ে বাংলাদেশ আজ শোকস্তব্ধ। তবে তাঁর রেখে যাওয়া রাজনৈতিক দর্শন ও গৌরবময় ইতিহাস আগামী প্রজন্মের জন্য সবসময় অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
