নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তুমুল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার খবরে লালমনিরহাটে যখন বিজয় উল্লাস চলছিল, তখন অন্যদের মতো মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন কোরআনের হাফেজ আজিজুল ইসলাম। দুপুরে পাটগ্রাম উপজেলার শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ঝালঙ্গী (ডাঙ্গারবাড়ি) গ্রামের আব্দুর রহিমের ছেলে আজিজুল সেই মিছিলে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান।
কিন্তু একদল অসাধু ব্যক্তি এই দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুকে পুঁজি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে উঠেপড়ে লেগেছে।আজিজুলের মৃত্যুর প্রায় ১১ মাস পর তাঁকে ‘জুলাই শহীদ’ দাবি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। জুলাইযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে মোশাররফ হোসেন নামের হাতীবান্ধার এক বাসিন্দা বাদী হয়ে এই মামলাটি করেন, যাতে আসামি করা হয়েছে অর্ধশতাধিক মানুষকে। অথচ এই মামলা সম্পর্কে কিছুই জানত না নিহতের পরিবার। মামলার বাদীর সঙ্গে নিহত আজিজুলের রক্তের বা দূরসম্পর্কের কোনো আত্মীয়তার সম্পর্কও নেই।
এদিকে ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় জুলাই শহীদদের নামের তালিকাসংবলিত যে গেজেট প্রকাশ করেছে, উপসচিব হরিদাস ঠাকুর স্বাক্ষরিত ওই গেজেটে দেখা যায়, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাওয়া আজিজুল ইসলামের গেজেট নম্বর ৭১৮।মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বাদী মোশাররফ হোসেন দাবি করেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তিনি পাটগ্রামের কাউয়ামারী বাজারে উপস্থিত থেকে আওয়ামী লীগ সরকার পতন আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, ‘ওই দিন ছাত্র-জনতার আন্দোলন বাধাগ্রস্ত করতে স্থানীয় মোশাররফ হোসেন প্রধান কলেজের সামনে আসামিরা বাঁশের খুঁটিতে থাকা বৈদ্যুতিক তার ফেলে দিলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী আজিজুল।’ বাদী এজাহারে আরও উল্লেখ করেন, নিহতের পরিবার-স্বজন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে আলোচনা করে এজাহার দায়ের করতে বিলম্ব হয়েছে।মামলার নথি অনুযায়ী, মোশাররফের দায়ের করা এই মামলায় ৪৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ দুজন সাংবাদিককেও আসামি করা হয়। মামলার ৩৪ নম্বর আসামি করা হয়েছে দৈনিক ইত্তেফাকের পাটগ্রাম উপজেলা প্রতিনিধি ও পাটগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আজিজুল হক দুলালকে এবং ৪১ নম্বর আসামি করা হয়েছে সমকালের ওই উপজেলার সংবাদদাতা মামুন হোসেন সরকারকে।মামলার আসামি হওয়ার পর গ্রেপ্তার এড়াতে ওই দুই সাংবাদিক দীর্ঘ কয়েক মাস পরিবার-সন্তান রেখে আত্মগোপনে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তদন্তে ঘটনাস্থলে তাঁদের উপস্থিত না থাকা ও সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় গত বছরের ১০ নভেম্বর ওই দুই সাংবাদিককে অব্যাহতির আবেদন জানিয়ে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. আব্দুল জলিল।মিথ্যা মামলার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিক আজিজুল হক দুলাল বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আমি পাটগ্রাম পৌর শহরে অবস্থান করে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছি।
তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সেটা অনায়াসেই বের করতে পেরেছে। অথচ প্রায় আট কিলোমিটার দূরের একটি ঘটনার উদ্ভট মামলায় আমাকে আসামি করে মাসের পর মাস হয়রানি করা হয়েছে।’একই মামলার ভুক্তভোগী সাংবাদিক মামুন হোসেন সরকার বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২১ কিলোমিটার দূরে আমার বাড়ি বাউরা এলাকায় অবস্থান করলেও একটি দুর্ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড দেখিয়ে মামলায় অন্যদের সঙ্গে আমাকেও আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনার মূল নায়কসহ পুরো চক্রটিকে শাস্তির আওতায় আনা হোক।’সরেজমিনে লালমনিরহাট শহর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরের পৌর শহর পাটগ্রাম থেকে আরও প্রায় ১৬ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে ভারতীয় সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার কাছে ঝালঙ্গী (ডাঙ্গারবাড়ি) গ্রামে আজিজুলের বাড়িতে গিয়ে তাঁর বাবা আব্দুর রহিম, মা রেজিয়া খাতুন এবং বড় ভাই জালাল ইসলামের সঙ্গে কথা বললে তাঁরাও এই মামলার বিষয়ে বিস্ময় ও অজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একটি দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এভাবে মিথ্যা মামলা ও নিরপরাধ মানুষকে হয়রানির ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহলে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
