নিজস্ব প্রতিবেদক | গাইবান্ধা
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় যেন এক মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। একটি বেওয়ারিশ পাগলা কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত ১৪ জনের মধ্যে গত এক সপ্তাহে একে একে ৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই ধারাবাহিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে নারী ও শিশুসহ আরও ৯ জন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন, যাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত স্বজনরা।
গত ২২ এপ্রিল উপজেলার বজরা কঞ্চিবাড়ি এলাকায় একটি বেওয়ারিশ কুকুর অতর্কিত হামলা চালিয়ে ১৪ জনকে রক্তাক্ত করে। এরপর শুরু হয় ট্র্যাজেডি: গত বুধবার দুপুরে মারা যান সুলতানা বেগম (৩৯),সোমবার রাতে প্রাণ হারান আফরুজা বেগম (৪০),শুক্রবার কাঠমিস্ত্রী রতনেশ্বর বর্মণ (৫০) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।৬ মে মারা যান নন্দ রানী (৫৫) ও ফুলু মিয়া (৫২)।
নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, সময়মতো ভ্যাকসিন না পাওয়া এবং হাসপাতালের অবহেলাই এই মৃত্যুর প্রধান কারণ। সুলতানা বেগমের ছেলে আল আমিন জানান, সরকারি হাসপাতালে ভ্যাকসিন না পেয়ে বাইরে থেকে কিনে আনতে আনতেই মহামূল্যবান সময় পার হয়ে যায়।
এই ঘটনা দেশের স্বাস্থ্য খাতের এক কঙ্কালসার রূপ উন্মোচন করেছে। সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওই সময় কোনো ভ্যাকসিন ছিল না। এমনকি গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালেও মিলছে না জলাতঙ্কের প্রতিষেধক।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা দিবাকর বসাকের বক্তব্যে অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। তিনি জানান, ভ্যাকসিন কেনার জন্য বরাদ্দ পাওয়া গেছে মাত্র **১৫ হাজার টাকা**, যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। প্রশ্ন উঠছে, সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য কি এতটাই কম?
গাইবান্ধার এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি সারাদেশে আসন্ন এক ভয়াবহ সংকটের অশনি সংকেত।
দেশের অধিকাংশ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে জলাতঙ্ক বা র্যাবিস ভ্যাকসিনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। দরিদ্র রোগীরা সরকারি হাসপাতালে না পেয়ে চড়া দামে ফার্মেসি থেকে ভ্যাকসিন কিনছে। কিন্তু সেই ভ্যাকসিনের মান এবং সঠিক তাপমাত্রায় (Cold Chain) তা সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, কুকুরে কামড়ানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভ্যাকসিন নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু গাইবান্ধার ভুক্তভোগীরা হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে সেই সময় পার করে ফেলেছেন। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান স্পষ্ট জানিয়েছেন, সঠিক সময়ে কার্যকর ভ্যাকসিন নিলে মৃত্যু হওয়ার কথা নয়।
বেওয়ারিশ কুকুর নিধন বা টিকাদান কর্মসূচি স্থবির হয়ে পড়ায় রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এখন তলানিতে।
এতে স্কুলগামী শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রমণের শিকার হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগে ভ্যাকসিনের জন্য নামমাত্র বরাদ্দ থাকায় সাধারণ মানুষ সেবা বঞ্চিত হচ্ছে। বেসরকারি ফার্মেসিতে বিক্রীত ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে কোনো নজরদারি নেই।

