সবাই থানায় গিয়ে বললো যে, ও তো ছোট মানুষ। ওকে ছেড়ে দিন। পরেরদিন টেস্ট পরীক্ষা, সেটাও বলা হলো। কিন্তু থানার ওসি বললো যে, না ছাড়া যাবে না।” কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে গত বছরের সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন ষোলো বছরের কিশোর রোহান (ছদ্মনাম)।
কেবল রোহান নয়, বাংলাদেশে সম্প্রতি নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে তার মতো আরও অনেক স্কুল শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন আজ রাষ্ট্রীয় নিপিড়নের জাঁতাকলে পিষ্ট।
রোহানের অপরাধ ছিল তার বাবার রাজনৈতিক পরিচয়। তার বাবা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা হওয়ায় বাবা-ছেলে দু’জনকেই সন্ত্রাস বিরোধী আইনের মামলায় আসামি করা হয়।পলাতক থেকেও শুধুমাত্র এসএসসি’র টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিতে নানুবাড়ি ফিরেছিলেন রোহান। ভেবেছিলেন পালিয়ে থেকেই পরীক্ষা দেবেন। কিন্তু প্রথম পরীক্ষার রাতেই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। রোহান বলেন, “ভেবেছিলাম পরীক্ষাটা অন্তত দিতে পারবো। কিন্তু পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে গেল”।
চার মাসেরও বেশি সময় কারাগারে থাকার পর এসএসসি পরীক্ষার মাত্র একদিন আগে মুক্তি পান রোহান। ততদিনে তার সহপাঠীরা পরীক্ষার টেবিলে থাকলেও রোহানের বসার সুযোগ নেই। জেলখানা থেকে আদালতে আবেদন করেও কোনো লাভ হয়নি। কারণ স্কুল কর্তৃপক্ষ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, টেস্ট পরীক্ষা ছাড়া ফরম ফিলাপ সম্ভব নয়। অথচ রোহান যখন কারাগারে ছিলেন, তখন তার পরীক্ষা দেওয়ার কোনো সুযোগই রাখা হয়নি।
বর্তমানে দেশে বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং সন্ত্রাস বিরোধী আইনের মতো বিতর্কিত ধারাগুলোকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের এক নগ্ন মহোৎসব চলছে। এসব মামলায় আটক কিশোরদের অনেকে সাধারণ আইনি সুবিধা বা জামিন পর্যন্ত পাচ্ছে না।
মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, একটি রাষ্ট্র কতটা দেউলিয়া হলে তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কলম কেড়ে নিয়ে হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেয়, এটি তার এক বীভৎস উদাহরণ। অপরাধ যাই হোক, একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে বাধা দেওয়া এবং তাকে সাধারণ অপরাধীদের মতো দীর্ঘকাল কারান্তরীণ রাখা আধুনিক বিচারব্যবস্থার জন্য চরম লজ্জাজনক। রোহানদের এই আর্তনাদ কি পৌঁছাবে রাষ্ট্রের কানে, নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বলি হয়ে এভাবেই ঝরে যাবে হাজারো সম্ভাবনা?
