নিজস্ব প্রতিনিধি :
দেশে হাম পরিস্থিতি এখন আর কেবল একটি সাধারণ রোগতাত্ত্বিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। সরকারি হিসাবে হামে মৃত্যুর সংখ্যা ৩৪১ বলা হলেও, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও মাঠ পর্যায়ের তথ্যানুযায়ী প্রকৃত মৃত্যুসংখ্যা ১,২০০ ছাড়িয়ে গেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক ভাবমূর্তি রক্ষা এবং নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে বর্তমান সরকার মৃত্যুর প্রকৃত পরিসংখ্যান গণমাধ্যমে আসতে দিচ্ছে না। তথ্য কাটছাঁট করার এই ‘ফিল্টারিং’ প্রক্রিয়ার আড়ালে নীরবে শত শত মায়ের কোল খালি হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই মহামারির প্রধান কারণ সময়মতো টিকা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় এবং বিতরণে সরকারের চরম অদূরদর্শিতা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের টিকা ক্রয়ে স্থবিরতা শিশুদের সুরক্ষা বলয়কে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। গত এক বছর ধরে শিশুদের অত্যাবশ্যকীয় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল না খাওয়ানো এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিটামিন ‘এ’-র অভাব হামের জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
বর্তমানে হাসপাতালগুলোতে টিকা ও জরুরি সরঞ্জামের তীব্র ঘাটতি থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো টনক নড়তে দেখা যাচ্ছে না।
গত ২৯ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ডা. চিরঞ্জিত দাস জানিয়েছিলেন যে, ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা পেতে ২-৩ সপ্তাহ সময় লাগে। কিন্তু এপ্রিলের শুরুতে বুস্টার ডোজ কার্যক্রম শুরু হওয়ার এক মাস পরেও মৃত্যুর রেকর্ড প্রতিদিন নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করার পরও সরকার ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করেনি মূলত নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে।
জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ এবং অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত সরকার নতুন কোনো বড় ব্যয় বা জনরোষের ভয়ে এই মহামারিকে ‘এলার্মিং’ বা উদ্বেগজনক হিসেবে স্বীকার করছে না। বরং রাজনৈতিক প্রভাবে প্রকৃত মহামারিকে আড়াল করার শেষ চেষ্টা চালানো হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
উপজেলা ও তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর চিত্র আরও ভয়াবহ। সেখানে কার্যকর আইসোলেশন ব্যবস্থা না থাকায় অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে আসা সুস্থ শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। হাসপাতালগুলো এখন সংক্রমণের ‘হটস্পটে’ পরিণত হয়েছে। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল এবং শক্তিশালী রোগ নজরদারি ব্যবস্থা (Surveillance) না থাকায় আক্রান্ত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, “সরকার মূলত নামমাত্র টিকা কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে দায় সারতে চাইছে। কিন্তু যেখানে নজরদারি নেই, ভিটামিন ‘এ’ নেই এবং হাসপাতালের ভেতরেই সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, সেখানে কেবল টিকা দিয়ে এই মৃত্যুমিছিল থামানো সম্ভব নয়। তথ্য গোপন করে কখনোই মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না; এতে কেবল সংক্রমণ আরও ডালপালা মেলে।”
একদিকে অর্থনৈতিক অস্থিরতা, অন্যদিকে শিশুদের এই গণমৃত্যু—দেশ এক চরম ক্রান্তিকাল পার করছে। বেসরকারি হাসপাতাল, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল এবং বাড়িতে মারা যাওয়া শিশুদের বড় একটি অংশ সরকারি তথ্যে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় প্রকৃত চিত্র অন্ধকারে থেকে যাচ্ছে। মৃত শিশুদের এই প্রকৃত সংখ্যা যদি আড়ালেই থেকে যায়, তবে যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এখনই রাজনৈতিক বিবেচনা সরিয়ে রেখে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা ঘোষণা এবং কার্যকর আইসোলেশন ও পুষ্টি কার্যক্রম জোরদার না করলে এই মহামারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
