বিশেষ প্রতিবেদন:

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। যে আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন সমাজ আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সেই মহান আন্দোলনকে পুঁজি করেই এখন শুরু হয়েছে এক ভয়ংকর ‘মামলা বাণিজ্য’ ও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার নোংরা খেলা। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সাম্প্রতিক তদন্তে বেরিয়ে আসছে এমন সব তথ্য, যা শুনলে স্তম্ভিত হতে হয়।

আন্দোলনের শহীদদের রক্তের দাগ শুকানোর আগেই একদল স্বার্থান্বেষী মানুষ সেই আবেগ ও পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে লিপ্ত হয়েছে নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসানোর উৎসবে।

পিবিআইয়ের হাতে আসা ১৯৫টি মামলার জট খুলতেই বেরিয়ে আসছে পিলে চমকানো সব জালিয়াতি।

জীবিত মানুষ যখন ‘শহীদ’, রাজনৈতিক ফায়দা নিতে বা প্রতিপক্ষকে চিরতরে শেষ করতে জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে।

পরকীয়া ও পারিবারিক বিরোধের রংবদল, পরকীয়াজনিত কারণে খুন বা দীর্ঘদিনের জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে সরাসরি ‘আন্দোলনের সহিংসতা’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

 ডিভোর্সের প্রতিশোধ, ডিভোর্স দেওয়ায় স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে ফাঁসাতে নিজের নাবালক ছেলেকে দিয়ে মিথ্যা মামলা করিয়েছেন জনৈক পিতা।

অজ্ঞাতনামা বাদী, অনেক ক্ষেত্রে মামলার এজাহারে দেওয়া বাদীর ঠিকানার কোনো অস্তিত্ব নেই, আবার অনেক বাদী জানেনই না যে তাদের নাম ব্যবহার করে শত শত মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

পিবিআইয়ের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত তদন্তাধীন ১৯৫টি মামলার মধ্যে ২৪টির কোনো সত্যতা মেলেনি। উল্টো তদন্তে ফেঁসে যাওয়ার ভয়ে বাদীপক্ষ নিজ থেকেই আরও ২০টি মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

সারাদেশে বর্তমানে এক নতুন আতঙ্কের নাম “জুলাই অভ্যুত্থানের মামলা”। বিশেষ করে এজাহারে কয়েকশ নামীয় আসামির পাশাপাশি যখন হাজার হাজার ‘অজ্ঞাতনামা’ আসামি রাখা হয়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে গ্রেফতার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ উঠছে, এই ‘অজ্ঞাতনামা’ তকমা ব্যবহার করে একশ্রেণির অসাধু চক্র ও পুলিশি সোর্সরা নিরীহ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

পাওনাদারকে হয়রানি করতে তাকে আন্দোলনের হত্যাকারী বানিয়ে মামলা ঠুকে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। গ্রামে গ্রামে দীর্ঘদিনের দলাদলি মেটানোর মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে জুলাই আন্দোলনের মামলাকে।

 ‘নিরপরাধ কেউ সাজা পাবে না’

এই গণহারে মামলা ও হয়রানি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকারও। গত বুধবার জেলা প্রশাসক সম্মেলনে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা (যিনি বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন) সালাহউদ্দিন আহমদ অত্যন্ত কঠোর বার্তা দিয়েছেন।

Leave A Reply

Exit mobile version