প্রচারণায় যতটা ঝড় উঠেছিল, বাস্তবে ততটাই ফাঁপা বেলুন হয়ে ধরা দিয়েছে আশিক চৌধুরীর ‘ম্যাজিক

Infobangla অনলাইন ডেস্ক

অনলাইন ভার্সন

আপডেট: ০৯:২৮ | রবিবার | ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

দেখতে স্মার্ট, কথাবার্তায় সাবলীল, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ—অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদেশ থেকে ‘হায়ার’ করে আনা হয়েছিল তাঁকে। বলা হয়েছিল, খরা কাটিয়ে তিনি বাংলাদেশে বিনিয়োগের জোয়ার বইয়ে দেবেন। সেই আশার নাম ছিল আশিক চৌধুরী।

দেড় বছর পেরিয়ে গেল। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে আশিক চৌধুরীর সময়কালে বড় বাজেটের বিদেশি বিনিয়োগ সম্মেলন হয়েছে, ঝলমলে উপস্থাপনা হয়েছে, ‘এফডিআই হিটম্যাপ’ প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু মাঠের বিনিয়োগ? তা যেন কাগজেই আটকে আছে।

সংখ্যাই বলছে ব্যর্থতার গল্প

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে নিট এফডিআই বেড়ে ১৬৯ কোটি ডলারে পৌঁছালেও নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৫৫ কোটি ডলার—গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থাৎ পুরোনো বিনিয়োগকারীদের পুনর্বিনিয়োগে হিসাব ফুললেও নতুন বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসছেন না।

অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, একই অর্থবছরে বিডায় নিবন্ধিত মোট বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে প্রায় ৫৮ শতাংশ। করোনাকালেও যেখানে এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব এসেছিল, সেখানে আশিক চৌধুরীর সময়ে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে তলানিতে।

দেশি বিনিয়োগকারীরাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন

দেশের ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজনৈতিক সরকারের অনুপস্থিতি, আইন-শৃঙ্খলার দুর্বলতা, ব্যাংক খাতের ইমেজ সংকট এবং ১৫ শতাংশের বেশি সুদহারে বিনিয়োগ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নেমে এসেছে ৭ শতাংশের নিচে, শিল্পকারখানা বন্ধ হচ্ছে, কর্মসংস্থান কমছে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ প্রশ্ন রাখেন—“যেখানে দেশি উদ্যোক্তারাই টিকতে পারছেন না, সেখানে বিদেশিরা কেন বিনিয়োগ করবে?”

‘মিরাকল’ বনাম বাস্তবতা

বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান দাবি করছেন, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এফডিআই বৃদ্ধি একটি ‘মিরাকল’। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই বৃদ্ধি কাগুজে। সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, জমি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, সুদহার—সবখানেই সংকট থাকলে বিনিয়োগ চক্র থেমে যেতেই বাধ্য।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য আরও বিব্রতকর। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ পেয়েছে দেড় বিলিয়ন ডলারের এফডিআই, যেখানে ভারত পেয়েছে ২৭ বিলিয়ন, ভিয়েতনাম ২০ বিলিয়ন, এমনকি পাকিস্তানও বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে।

গর্জন বেশি, বর্ষণ কম

সমালোচকদের মতে, আশিক চৌধুরীর তৎপরতা বেশি ছিল বন্দর, লজিস্টিকস ও বড় অবকাঠামো চুক্তিকে ঘিরে। নীতিগত সংস্কার, ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর মতো মৌলিক সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজের ভাষায়, “উদ্যোগ ছিল, কিন্তু সাহসী সংস্কার হয়নি।”

ফলে বিনিয়োগ প্রচারণায় যতটা ঝড় উঠেছিল, বাস্তবে ততটাই ফাঁপা বেলুন হয়ে ধরা দিয়েছে আশিক চৌধুরীর ‘ম্যাজিক’।

Infobangla পর্যবেক্ষণ বলছে, ঝলমলে উপস্থাপনা আর বড় বড় ঘোষণায় বিনিয়োগ আসে না। আসে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আস্থা এবং বাস্তব সংস্কারে। আর সেখানেই দেড় বছরে বড় প্রশ্নচিহ্ন রেখে যাচ্ছেন আশিক চৌধুরী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *