বিশেষ প্রতিনিধি: “ছোটভাইকে ফোন করে বলেছিলাম আমাদের থানা অ্যাটাক করেছে। আমি মনে হয় আর বাঁচবো না। সুযোগ নাই আমাদের বাঁচার… এটাই আমার শেষ কথা। সন্তানগুলো দেখে রাখিস।”
মৃত্যুকে একেবারেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজ ভাইয়ের কাছে মোবাইল ফোনে এভাবেই ‘শেষ বিদায়’ নিয়েছিলেন সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল মালেক। চব্বিশের ৪ঠা আগস্ট সরকারবিরোধী চরম উত্তেজনার মধ্যে হাজার হাজার মারমুখী মানুষের থানা ঘেরাও ও আক্রমণের মুহূর্তে এটিই ছিল তার শেষ আকুতি। আব্দুল মালেক অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে গেলেও, সেদিন এনায়েতপুর থানায় দায়িত্বরত ৫৭ জন পুলিশ সদস্যের মধ্যে অফিসার ইনচার্জসহ (ওসি) ১৫ জন সদস্য নির্মমভাবে নিহত হন।
বাড়ি বাড়ি তল্লাশি ও বাথরুমে পিটিয়ে হত্যা
ঘটনার দিন সকালে প্রায় ৫-৬ হাজার সহিংসতাকারী প্রথম দফায় এলে পুলিশের অনুরোধে ফিরে যায়। কিন্তু দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে তারা পুনরায় সংগঠিত হয়ে সরাসরি থানায় আক্রমণ চালায়। পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। হামলাকারীরা থানায় আগুন ধরিয়ে দিলে প্রাণ রক্ষায় পুলিশ সদস্যরা পেছনের দিকের বাড়িগুলোতে আশ্রয় নেন।
কিন্তু সহিংসতাকারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি চালায়। পেছনের এক বাড়ির বাথরুমে লুকিয়ে থাকা পুলিশ সদস্যদের টেনে বের করে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং লাশের স্তূপ জমানো হয় বাড়ির আঙিনায়। এমনকি নিহত এক পুলিশ সদস্যকে কাছের বাজারে একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখার মতো রোমহর্ষক ঘটনাও ঘটে। পরে সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুলি লুট হয়, যার মধ্যে ৬টি রাইফেল-পিস্তল ও বিপুল গুলি আজও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
‘গর্ভবতী’ আকুতিতেও মেলেনি ছাড়, বাঁচানো সহকর্মীও নিহত
ঘটনার দিনে ছড়িয়ে পড়া এক গুজবে বলা হয়েছিল, এক অন্তর্বাসিনী নারী কনস্টেবলকে হত্যা করা হয়েছে। পরবর্তীতে জানা যায়, ওই নারী পুলিশ সদস্য প্রাণ বাঁচাতে পেছনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে হামলাকারীদের হাত থেকে বাঁচাতে তার এক সহকর্মী কনস্টেবল চিৎকার করে বলেছিলেন, “ওর পেটে বাচ্চা আছে, একে মেরো না!”
যদিও ওই নারী সদস্য অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন না, তবু তাকে রক্ষার জন্য সহকর্মী মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাকে নির্মমভাবে পেটানো হয়, যার ফলে মাথায় সেলাই নিয়ে মূর্ছা যান তিনি। করুণ বিষয় হলো, তাকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করা সহকর্মী কনস্টেবল রবিউল ইসলামকেও সেদিন পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
কাফনের কাপড়ে মুড়ে লাশবাহী গাড়িতে জীবন রক্ষা
ঘটনার পর পরিস্থিতি এতটাই থমথমে ও আশঙ্কাজনক ছিল যে, চিকিৎসাধীন বেঁচে যাওয়া আহত পুলিশ সদস্যদের এনায়েতপুর থেকে সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সশরীরে নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। বাধ্য হয়ে পুলিশের আহত সদস্যদের সাদা কাফনের কাপড়ে মুড়ে লাশবাহী গাড়িতে করে পুলিশ সুপার অফিসে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
মবের মুখে মামলা ও তদন্তের বর্তমান চিত্র
ওই নৃশংস ঘটনার ২১ দিন পর ২৬শে আগস্ট একটি পুলিশ বাদী হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটিতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের স্থানীয় ৪ জন নেতা এবং অজ্ঞাতনামা ৫-৬ হাজার মানুষকে আসামি করা হয়। এক নম্বর আসামি এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আহমেদ মোস্তফা খান বাচ্চু কারাগারেই মারা যান এবং সাবেক মন্ত্রী লতিফ বিশ্বাসসহ বেশ কয়েকজন দীর্ঘসময় কারাভোগ করেন।
তবে এই মামলার প্রক্রিয়ায় উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। মামলার বাদী এসআই আব্দুল মালেক জানান, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও শারীরিক গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে শুধু স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছিল, এজাহার লিখেছিল ঊর্ধ্বোতন কর্তৃপক্ষ। তৎকালে বিভাগীয় পুলিশের দায়িত্বশীল পদের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, “তৎকালীন নাজুক পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক চাপে মবের মুখে বাধ্য হয়ে এই মামলাটি ভুল-ত্রুটিসহ ওই ফরম্যাটে রেকর্ড করা হয়েছিল।”
জেলা পুলিশের তথ্যমতে, এনায়েতপুরের ঘটনার মোট চারটি মামলার তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে এবং পুলিশ হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিহত ১৫ জন পুলিশ সদস্যের স্মরণে সেই রক্তঝরা ৪ঠা আগস্টের স্মৃতি আজও এনায়েতপুর ও দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এক কালো অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

