নিজস্ব প্রতিবেদক (লন্ডন ও ঢাকা) :
বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ঐতিহাসিক ‘অক্সফোর্ড ইউনিয়ন সোসাইটি’র অফিশিয়াল আমন্ত্রণপত্র পাওয়া যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্যই পরম সৌভাগ্যের। কিন্তু সেই পরম সম্মানকে যদি স্রেফ ‘পাউন্ডের জোরে’ পকেটে পুরে, দেশের মানুষের চোখে ধুলো দেওয়া হয়? ঠিক এমন একটি অভিনব ও লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম দুই পরিচিত মুখ—জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং ডাকসু ভিপি আবু সাদিক কায়েম।
যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক অক্সফোর্ড ইউনিয়ন সোসাইটির ডিবেটিং চেম্বার ব্যক্তিগতভাবে ভাড়া নিয়ে নিজেদের ‘অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রিত অতিথি’ হিসেবে জাহির করার এক চাঞ্চল্যকর প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে তাঁদের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত রোববার (১৪ জুন) সেখানে অনুষ্ঠিত ‘দ্য স্টুডেন্ট-লেড আপরাইজিং অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব পোস্ট-রেভল্যুশনারি বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনাটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ছিল না; বরং এটি ছিল স্রেফ টাকার বিনিময়ে হল বুকিং করে সাজানো একটি মহানাটক!
অনুষ্ঠানটি শেষ হতেই হাসনাত ও সাদিক কায়েম তাঁদের ফেসবুক পেজে অবতীর্ণ হন ‘বিজয়ীর’ বেশে। সাধারণ নেটিজেন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের আবেগ নিয়ে খেলতে তাঁরা প্রচার করতে থাকেন একের পর এক বিভ্রান্তিকর তথ্য।
ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম তাঁর ফেসবুক পেজে আপলোড করা একটি ভিডিও বার্তার ঠিক ৬ সেকেন্ডের মাথায় সরাসরি বুক ফুলিয়ে দাবি করেন, “আমি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির আমন্ত্রণে এখানে এসেছি।”
অপরদিকে হাসনাত আব্দুল্লাহ তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেও বীরদর্পে ভিডিও শেয়ার করা হয়, যার শিরোনাম ছিল—‘অক্সফোর্ড ইউনিয়নের আমন্ত্রণে ঐতিহাসিক সেমিনার কক্ষে হাসনাত আব্দুল্লাহ’।
মুহূর্তেই লাখ লাখ লাইক আর প্রশংসার বন্যায় ভেসে যান তাঁরা। কিন্তু এই ‘ডিজিটাল বাহবা’র আড়ালে যে বড় ধরনের এক ধোঁকাবাজি লুকিয়ে ছিল, তা হয়তো ঢাকা পড়েই যেত—যদি না যুক্তরাজ্য প্রবাসী এক গবেষক এর গভীরে গিয়ে তদন্ত শুরু করতেন।
অক্সফোর্ড ইউনিয়নের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট (oxford-union.org) একটু খতিয়ে দেখলেই যে কেউ বুঝতে পারবেন, এই ঐতিহাসিক ডিবেটিং চেম্বারে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেওয়া আসলে কোনো দূরূহ স্বপ্ন নয়। টাকা থাকলেই যে কেউ হতে পারেন এখানকার ‘বক্তা’।
ওয়েবসাইটের ‘প্রাইভেট হায়ার’ (Private Hire) বা ‘হায়ার এ রুম’ (Hire a Room) সেকশনে স্পষ্ট ভাষায় বলা আছে, তাদের এই ঐতিহাসিক চেম্বারটি মূলত একটি ‘ড্রাই হায়ার ভেন্যু’ (Dry Hire Venue)। অর্থাৎ, ন্যূনতম দুই ঘণ্টার জন্য ঘণ্টাপ্রতি নির্দিষ্ট ফি দিয়ে পৃথিবীর যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থা এটি ব্যক্তিগত বা সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া নিতে পারেন। এর জন্য অক্সফোর্ডের ছাত্র হওয়া কিংবা ইউনিয়নের মেম্বার হওয়া তো দূরের কথা, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কেরও প্রয়োজন নেই।
নিজের পকেটের টাকা খরচ করে, নিজস্ব কারিগরি ও ব্যবস্থাপনায় সেখানে অনুষ্ঠান করা যায়। হাসনাত-সাদিকের ক্ষেত্রেও ঠিক এই কাজটিই করেছিল স্থানীয় কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি।
হাসনাত ও সাদিকের এই ‘অক্সফোর্ড বিজয়’ নিয়ে খটকা লাগায় অনুসন্ধানে নামেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন মোহাম্মদ। আর তাতেই বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। বিষয়টিকে প্রমাণসহ চড় থাপ্পড় মারতে তিনি নিজেই নেমে পড়েন মাঠে।
আগামী ১৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ‘মহিউদ্দিন মোহাম্মদ ফ্যান ক্লাব ইউকে’ নামের একটি নামসর্বস্ব সংগঠনের ব্যানারে বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সেই ঐতিহাসিক ডিবেটিং চেম্বারটি বুকিং করে বসেন তিনি। বুকিং ফি বাবদ তিনি পকেট থেকে গুনে দেন ২ হাজার ৪৮ পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা)। টাকা পরিশোধের সাথে সাথেই অক্সফোর্ড ইউনিয়ন তাঁকে ‘R19721053’ নম্বরের একটি অফিশিয়াল রিজার্ভেশন কনফার্মেশন লেটার পাঠিয়ে দেয়!
মহিউদ্দিন মোহাম্মদ প্রমাণ করে দিলেন, ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা থাকলে আগামীকাল আপনিও ‘অক্সফোর্ড ইউনিয়নের আমন্ত্রিত বক্তা’ সেজে ফেসবুকে লাইভ করতে পারবেন!
এই জালিয়াতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ৪টি প্রশ্ন সহকারে অক্সফোর্ড ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে ইমেইল পাঠিয়েছিলেন মহিউদ্দিন মোহাম্মদ। জবাবে অক্সফোর্ড ইউনিয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে লিখিত ও টেলিফোনে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে—১৪ জুনের ওই অনুষ্ঠানের সাথে বিশ্ববিদ্যালয় বা ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দূরতম সম্পর্কও ছিল না। ওটি সম্পূর্ণ একটি ব্যক্তিগত (Private Capacity) ইভেন্ট ছিল।
একই সাথে কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, কোনো ভাড়াটে যদি তাঁদের এই ব্যক্তিগত ভেন্যু ব্যবহার করে বাইরে নিজেদের ‘অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বা ইউনিয়নের প্রাতিষ্ঠানিক আমন্ত্রিত অতিথি’ হিসেবে মিথ্যাচার বা প্রোপাগান্ডা চালায়, তবে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের চিরকালের জন্য কালো তালিকাভুক্ত (Blacklist) করা হবে এবং প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অক্সফোর্ডে অধ্যয়নরত সাধারণ প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা এই ঘটনায় চরম ক্ষোভ ও লজ্জা প্রকাশ করেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, অক্সফোর্ড ইউনিয়ন বা বিশ্ববিদ্যালয় যখন কোনো অনুষ্ঠান বা বক্তাকে আমন্ত্রণ জানায়, তা তাদের অফিশিয়াল ইভেন্ট ক্যালেন্ডার এবং ভেরিফায়েড সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে প্রকাশ করা হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইমেইল পান। কিন্তু ১৪ জুনের এই অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে দাপ্তরিক কোনো হদিসই ছিল না।
শিক্ষার্থীদের মতে, ব্যক্তিগত পকেটের টাকা দিয়ে হল ভাড়া করে সেটিকে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল আমন্ত্রণ’ বলে চালিয়ে দেওয়ার এই সস্তা ও অভিনব প্রতারণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সততা, বিশ্বস্ততা এবং সামগ্রিকভাবে দেশের ভাবমূর্তিকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিপ্লব ও সততার বুলি আওড়ানো তরুণ নেতাদের কাছ থেকে এমন ‘পাউন্ড-প্রতারণা’ কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

