পুলিশ  হত্যায় ‘উস্কানির অভিযোগ’ থাকা সেই সাইয়্যেদ আব্দুল্লাহ এখন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী

নিজস্ব প্রতিবেদক : ঢাকা, ২ এপ্রিল ২০২৬

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংস রাজনৈতিক অস্থিরতার ভয়াবহ স্মৃতি এখনও তাজা। সেই সময় রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও সাভারে সংঘটিত নৃশংস হামলায় বহু পুলিশ সদস্য প্রাণ হারান—যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর অন্যতম ভয়াবহ আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই রক্তাক্ত ঘটনার প্রেক্ষাপটে নতুন করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এক সাম্প্রতিক সরকারি নিয়োগ।

সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় ইউটিউবার ও টিকটকার মো. সাইয়্যেদ বিন আব্দুল্লাহ (সাইয়্যেদ আব্দুল্লাহ)-কে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (যুব কর্মসংস্থান বিষয়ক) হিসেবে গ্রেড-২ পদমর্যাদায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সহিংসতার সময় তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল—গুজব ছড়িয়ে জনতাকে উত্তেজিত করা এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলায় উস্কানি দেওয়ার।

অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ আগস্ট সন্ধ্যার পর সাইয়্যেদ আব্দুল্লাহ ফেসবুক লাইভ ও পোস্টে দাবি করেন—ঢাকায় অবস্থানরত “ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এজেন্টরা” রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও সাভারে অবস্থান নিয়েছে এবং সেখান থেকে “ঢাকা দখলের পরিকল্পনা” করছে।

এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উসকানিমূলক বলে উল্লেখ করেছেন অনেক বিশ্লেষক।

এই বার্তা ছড়িয়ে পড়ার পর উত্তেজিত জনতা রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও সাভার থানায় হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। সাভারে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়—অনেক পুলিশ সদস্য নিহত হন, অনেকে গুরুতর আহত হন।

প্রাণে বাঁচতে কিছু সদস্য সাভার ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নিলে, সেখানেও উত্তেজিত জনতা ভিড় করে “এজেন্ট খোঁজার” নামে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং পুরো রাতজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করে।

সমালোচকদের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ওই গুজব পরিস্থিতিকে বিস্ফোরক করে তোলে। যদিও সাইয়্যেদ আব্দুল্লাহ পরবর্তীতে তার কিছু লাইভ ও পোস্ট মুছে ফেলেন, তবে বিভিন্ন স্ক্রিনশট ও শেয়ার এখনো অনলাইনে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—এই ধরনের ডিজিটাল কনটেন্ট কি সরাসরি সহিংসতা উস্কে দিতে ভূমিকা রেখেছিল?

তার এই নিয়োগের খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

সমালোচকদের ভাষায়, এটি “নিহত পুলিশ সদস্যদের প্রতি অবমাননা”

কেউ কেউ বলছেন, “ন্যায়বিচারের প্রতি এটি স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ”

অন্যদিকে, তার সমর্থকরা দাবি করছেন—তিনি ২০২৪ সালের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন, আর সেই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই পদ দেওয়া হয়েছে।

৫ আগস্টের ঘটনাগুলো নিয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই উঠছে। এই নিয়োগ সেই দাবিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পুরো ঘটনাটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—

সোশ্যাল মিডিয়ার গুজব কতটা বিপজ্জনক হতে পারে?

সহিংসতায় উস্কানির অভিযোগ থাকলে জবাবদিহি কোথায়?

গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগে স্বচ্ছতা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে?

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি।

উল্লেখ্য ;

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতা শুধু একটি রাজনৈতিক অধ্যায় নয়—এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও ডিজিটাল তথ্যপ্রবাহের জটিল সম্পর্কের একটি সতর্কবার্তা। আর সেই প্রেক্ষাপটে বিতর্কিত নিয়োগ নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—অতীতের রক্তাক্ত ঘটনার বিচার ও সত্য উদঘাটন কি আদৌ হবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *