ডেস্ক রিপোর্ট | ঢাকা
একটি রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে হলে সর্বপ্রথম যে খাতে বিপ্লব ঘটাতে হয়, তা হলো যোগাযোগ ব্যবস্থা। উন্নত সড়ক, সেতু ও আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো ছাড়া শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান কোনোটিই টেকসই হয় না। অথচ স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে এই খাতটি ছিল সবচেয়ে অবহেলিত।
২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের রূপরেখা নেয়। জাতীয় মহাসড়কগুলোকে ৪ লেন থেকে ৮ লেনে উন্নীত করা, ভবিষ্যতে ১২ লেন পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা, শিল্পাঞ্চল ও ইপিজেড সংযোগে ১৪ লেনের মহাসড়ক ভাবনা এসব ছিল দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের অংশ।
তাদের সময়েই এই দেশে বাস্তবায়িত হয় একের পর এক মেগা প্রকল্প,
পদ্মা সেতু, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা–আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে,
ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে,ঢাকা মেট্রোরেল,মধুমাতি সেতু,বেকুটিয়া সেতুর মত আরও অনেক প্রকল্প।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের সড়ক নেটওয়ার্ক প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার থেকে বেড়ে ৩২ হাজার ৫০০ কিলোমিটারে উন্নীত হয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল সর্বত্র যোগাযোগ ব্যবস্থার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর সএই দৃশ্যপট বদলে যায়। ১৭ বছরের এক দূরদর্শী শাসন ব্যবস্থা শেষে আসে অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান ইউনুসের অধিনে দায়িত্ব গ্রহণ করে নতুন প্রশাসন। আর সেই সময় থেকেই যোগাযোগ খাতে এক ধরনের অদৃশ্য স্থবিরতা নেমে আসে।
আওয়ামীলীগএর আমলে অসম্পন্ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে ছিল
ঢাকা–আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন,
ভারতীয় সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পসমূহ, এবং মিঠামইন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মত জনকল্যাণমুখী প্রকল্প ।
এই প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করার বদলে কার্যত স্থগিত বা ধীরগতির পথে ঠেলে দেওয়া হয়। সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় ১২ থেকে ১৪ লেনের মহাসড়ক পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন সরকারের অনাগ্রহ প্রকাশ্যে চলে আসে।
প্রশ্ন উঠছে একটি নির্বাচিত সরকার কীভাবে এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে পারে? যোগাযোগ খাতের উন্নয়ন কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ভিত্তি। দীর্ঘ ১৭ বছরের যে উন্নয়নধারা তৈরি হয়েছিল, তা কি কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা অদূরদর্শিতার কারণে থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে?
অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও রপ্তানি সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হলো দ্রুত ও নিরাপদ যোগাযোগ। উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশের পথে এগোতে হলে অবকাঠামোগত গতি ধরে রাখা ছাড়া বিকল্প নেই। অথচ বর্তমান অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে, উন্নয়নের সেই গতি ইচ্ছাকৃতভাবেই শ্লথ করা হচ্ছে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় যাদের মাত্র দুই কার্যদিবস, তারা কি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল থামিয়ে দেওয়ার নৈতিক অধিকার রাখে? উন্নয়নের জোয়ারে যে দেশ গত এক দশকে বিশ্বমঞ্চে আত্মপ্রকাশ করেছে, সেই ধারাবাহিকতায় হঠাৎ এই স্থবিরতা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
যোগাযোগ খাতের এই অনিশ্চয়তা শুধু একটি সরকারের সিদ্ধান্ত নয় এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ আস্থা ও কর্মসংস্থানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। উন্নয়নের চাকা একবার থেমে গেলে তা পুনরায় সচল করতে যে সময় ও ব্যয় প্রয়োজন হয়, তার দায় কে নেবে এই প্রশ্ন আজ জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

