আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের সমর্থন নেই এই দাবীর পরও কেন ৩৫.৩৭% ভোটারকে বাধ্য করা হলো কেন্দ্রে যেতে?

ডেস্ক রিপোর্ট | ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (Transparency International Bangladesh) এবারের নির্বাচনে ২১.৪ শতাংশ জাল ভোট এবং ৩৫.৩৭ শতাংশ ভোটারকে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করার অভিযোগ উত্থাপন করেছে। এই পরিসংখ্যান রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দৃষ্টিকোণ থেকে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের জন্ম দেয়।

কারণ, রাজনৈতিক বয়ানে দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করা হচ্ছে যে আওয়ামী লীগ কার্যত জনসমর্থন হারিয়েছে। অন্যদিকে নিজেদের জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে বলে প্রচার চালানো বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এই দুই দলই এবারের নির্বাচনে সরাসরি মাঠে ছিল। সে প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, তাহলে এত বড় পরিসরে জাল ভোটের প্রয়োজন পড়ল কেন?


নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, যদি ভোটের মাঠে জনপ্রিয়তার শীর্ষ দাবি করা দলগুলো সক্রিয়ভাবে উপস্থিত থাকে, তাহলে ২১.৪ শতাংশ ভোট জাল করে বাক্সে ঢোকানোর যৌক্তিকতা স্পষ্ট হয় না। একইভাবে আরও বড় প্রশ্ন হলো যে ৩৫.৩৭ শতাংশ ভোটারকে কেন্দ্রে যেতে বা নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে, তারা কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক ছিলেন?


কারণ সাধারণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় কোনো দল সাধারণত প্রতিপক্ষের ভোটারদের জোর করে কেন্দ্রে আনে না। বরং যেসব ভোটার স্বাভাবিকভাবে ভোট দিতে অনাগ্রহী বা নিরুৎসাহিত, তাদেরই ভোট প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রিত করার চেষ্টা করা হয়। এই যুক্তি থেকে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, বাধ্য করা ভোটারদের একটি বড় অংশ এমন রাজনৈতিক শক্তির সমর্থক হতে পারে, যারা নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুপস্থিত ছিল।


এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দলটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ফলে তাদের সমর্থকদের একটি বড় অংশ ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ছিল। কিন্তু টিআইবির প্রতিবেদনে যদি সত্যিই ৩৫.৩৭ শতাংশের বেশি ভোটারকে কেন্দ্রে যেতে বাধ্য করার তথ্য উঠে আসে, তাহলে সেটি পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত দেয় এমন একটি বড় ভোটব্যাংক বিদ্যমান ছিল, যাদের ভোট নিয়ন্ত্রণ বা পুনর্নির্দেশের প্রয়োজন অনুভূত হয়েছে।


বিশ্লেষকরা বলছেন, এ বাস্তবতা আওয়ামী লীগের সমর্থন ‘নেই’ এই প্রচলিত রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বরং ডেটা বিশ্লেষণ বলছে, আওয়ামী লীগের সমর্থন কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, বাস্তব ভোট সমীকরণেও একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যথায়, তাদের ভোটকে প্রভাবিত করার প্রয়োজনই বা কেন পড়বে?
নির্বাচনের সামগ্রিক ভোট কাস্টিং হার নিয়েও যখন বিতর্ক রয়েছে, তখন ২১.৪ শতাংশ জাল ভোট এবং ৩৫.৩৭ শতাংশ ভোটারকে বাধ্য করার মতো তথ্য সামনে আসা একটি বিষয়ই স্পষ্ট করে আওয়ামী লীগের সমর্থনের পরিমাণ কোনো কল্পিত বা অতিরঞ্জিত দাবি নয়। বরং রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সমর্থন এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, নির্বাচনের ফল ও প্রক্রিয়ায় তার প্রভাব নিয়ন্ত্রণে বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন হয়েছে।


এই কারণেই টিআইবির প্রতিবেদন কেবল নির্বাচন ব্যবস্থার দুর্বলতাই নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের সামাজিক ও ভোটভিত্তিক উপস্থিতির একটি নীরব স্বীকৃতিও দিয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *