
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন |
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের অন্যতম মুখ থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসা সাবেক ক্রীড়া ও স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ল বিরুদ্ধে এবার উঠল ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্থপাচারের অভিযোগ। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, গত ১৬ মাসে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে উপার্জিত প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা দুবাই, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে পাচার করা হয়েছে।
‘দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ’ গড়ার শপথ নিয়ে ক্ষমতায় এলেও, পর্দার আড়ালে ‘আসিফ’ গড়ে তুলেছেন এক বিশাল অফশোর সাম্রাজ্য।লুটপাটের ১১ হাজার কোটি টাকা: কোন দেশে কত?গোয়েন্দা সূত্র ও আন্তর্জাতিক ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্সের নথিপত্র অনুযায়ী, পাচারকৃত অর্থের গন্তব্য চারটি প্রধান দেশ।
পাচারের ধরণ ও বিনিয়োগের একটি খসড়া চিত্র নিচে দেওয়া হলো:১. দুবাই (সংযুক্ত আরব আমিরাত): রিয়েল এস্টেট ও গোল্ড সুকসবচেয়ে বড় বিনিয়োগ করা হয়েছে দুবাইতে। অভিযোগ রয়েছে, আসিফ মাহমুদ এবং আসিফ নজরুল যৌথভাবে দুবাইয়ের ‘পাম জুমেইরাহ’ এবং ‘বিজনেস বে’ এলাকায় বিলাসবহুল ভিলা ও ফ্ল্যাট কিনেছেন।বিনিয়োগ: প্রায় ৪,৫০০ কোটি টাকা।কৌশল: হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে সেখানে ‘গোল্ডেন ভিসা’ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে রিয়েল এস্টেট কোম্পানি খোলা হয়েছে। আসিফ নজরুলের ঘনিষ্ঠ এক আত্মীয়ের নামে সেখানে একটি আইনি পরামর্শক ফার্মও খোলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২. সিঙ্গাপুর: বাণিজ্যিক বিনিয়োগ ও ট্রেডিংসিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ ও মেরিনা বে এলাকায় দুটি বড় ট্রেডিং কোম্পানির শেয়ার কেনা হয়েছে।বিনিয়োগ: প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা।কৌশল: এলজিইডি এবং ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কেনাকাটার ভুয়া বিল ও ওভার-ইনভয়েসিংয়ের টাকা সরাসরি সিঙ্গাপুরের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করা হয়েছে
৩. অস্ট্রেলিয়া: সেকেন্ড হোম ও হোটেল ব্যবসাআসিফ মাহমুদের পরিবারের সদস্যদের নামে সিডনি ও মেলবোর্নে একাধিক বাড়ি কেনার অভিযোগ পাওয়া গেছে।বিনিয়োগ: ২,০০০ কোটি টাকা।উদ্দেশ্য: ক্ষমতার পালাবদল হলে নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা। সিডনির উপকণ্ঠে একটি ৩-তারকা মানের হোটেল কেনার প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানা গেছে।
৪. সুইজারল্যান্ড: গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্টসুইজারল্যান্ডের জুরিখভিত্তিক একটি ব্যাংকে ‘শেল কোম্পানি’র নামে বিপুল অর্থ গচ্ছিত রাখা হয়েছে।জমা: ১,৫০০ কোটি টাকা।টাকার উৎস: আসিফ-সিন্ডিকেটের আয়ের পথঅনুসন্ধানে দেখা যায়, এই ১১ হাজার কোটি টাকা মূলত তিনটি প্রধান খাত থেকে এসেছে:মেগা প্রজেক্টে কমিশন: স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে (Cost Inflation) হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ আছে, শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর একক কারিগর ছিলেন আসিফ মাহমুদ।নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য: আসিফ মাহমুদের সাবেক এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন এবং আইন মন্ত্রণালয়ের সিন্ডিকেট মিলে সারা দেশে প্রকৌশলী, ডাক্তার এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি করে ‘রেট চার্ট’ অনুযায়ী টাকা আদায় করেছে।ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ: আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেনের নেতৃত্বে একটি ঠিকাদারি বলয় তৈরি করা হয়।
এলজিইডি ও গণপূর্তের বড় কাজগুলো এই সিন্ডিকেটের বাইরে কাউকে দেওয়া হতো না। এখান থেকে আসা লভ্যাংশের বড় একটি অংশ ডলারে কনভার্ট করে বিদেশে পাঠানো হতো।আসিফ নজরুলের ভূমিকা: আইনি সুরক্ষা ও পার্টনারশিপআইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে আইনি সুরক্ষা দিয়েছেন।বিদেশে টাকা পাঠানোর জন্য ভুয়া এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট কোম্পানি খোলার কাগজপত্রে আইনি সহায়তা দেওয়া।দুবাইতে যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে এই কালো টাকা সাদা করার প্রক্রিয়া তদারকি করা।সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা তদন্ত শুরু হলে তা আইন মন্ত্রণালয় থেকে ধামাচাপা দেওয়া।বাবার ‘ছায়া’ এবং এপিএসের ‘ব্যাগ’আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন এবং এপিএস মোয়াজ্জেম ছিলেন এই অর্থ সংগ্রহের মাঠপর্যায়ের কারিগর।
বিল্লাল হোসেন: কুমিল্লা ও এর আশেপাশের জেলায় ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে টাকা সংগ্রহ করতেন।এপিএস মোয়াজ্জেম: সচিবালয়ে বসে ডিল ফাইনাল করতেন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠার পর তাকে লোকদেখানো অব্যাহতি দেওয়া হলেও, তিনি মূলত সিন্ডিকেটের ক্যাশিয়ার হিসেবেই কাজ চালিয়ে গেছেন।ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-র সাবেক এক কর্মকর্তা
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিপ্লব পরবর্তী সময়ে এমন নজিরবিহীন দুর্নীতি জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার মানে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। যদি দুবাই এবং সিঙ্গাপুরে তাদের এই সম্পদের প্রমাণ মেলে, তবে আন্তর্জাতিক মানিলন্ডারিং আইনে তাদের বিচার হওয়া উচিত।”বিমানবন্দরে পিস্তলের ম্যাগাজিন কেলেঙ্কারি দিয়ে যে বিতর্কের শুরু, তা আজ ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। আসিফ মাহমুদ ও আসিফ নজরুলের এই ‘দুবাই সিন্ডিকেট’ উন্মোচিত হওয়ার পর জনমনে প্রশ্ন সংস্কারের নামে তবে কি শুধুই ক্ষমতার ও সম্পদের হাতবদল হয়েছে?

