নিজস্ব প্রতিবেদক | Info Bangla
গ্যাস-তেলের ঘাটতি, কারখানায় উৎপাদন মন্দা এবং সারের অভাবের এক চতুর্মুখী চাপে ধুঁকছে দেশের অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি আমদানির নির্ভরতা এবং বিশ্বব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত জুনের মূল্যায়নে স্পষ্ট উঠে এসেছে—এই বহিরাগত ধাক্কা দেশে তীব্র দারিদ্র্য ও বেকারত্বের ঝুঁকি বহু গুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর আশঙ্কায় পড়বেন। চলতি ২০২৬ সালে যেখানে প্রায় ১৭ লাখ মানুষের দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসার কথা ছিল, সেখানে তা নেমে আসতে পারে মাত্র ৫ লাখে। অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পরোক্ষ মাশুল হিসেবে কোটি মানুষের স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের দারিদ্র্য বৃদ্ধিতে অন্তত ১০ শতাংশ ভূমিকা রাখবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি।
বাংলাদেশ যখন আগে থেকেই দুর্বল ব্যাংক খাত, কমে আসা সরকারি ব্যয়ক্ষমতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপে জর্জরিত, তখনই এই নতুন ধাক্কা এল। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির অর্ধেকের বেশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি হয়। কিন্তু বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি চুক্তির পাঁচটিতেই ‘ফোর্স মেজর’ বা অপ্রত্যাশিত অচলাবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে খোলা বাজার থেকে আকাশচুম্বী মূল্যে (প্রতি ইউনিট ২৪ থেকে ২৮ ডলার) গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছে সরকার।
এই জ্বালানি সংকটের মাশুল গুনছে শিল্প ও কৃষি খাত। গ্যাসের অভাবে দেশের ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার পাঁচটিরই উৎপাদন এখন বন্ধ। আমদানিকৃত ইউরিয়ার দাম ইতোমধ্যেই ৩০ শতাংশ বেড়েছে, যা আরও দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতি হেক্টরে ৩৯১ দশমিক ৯ কেজি সার ব্যবহার করা বাংলাদেশের কৃষি খাত সারের তীব্র ঘাটতিতে পড়লে খাদ্যনিরাপত্তা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। এর পাশাপাশি জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয়বৃদ্ধিতে দেশের ২৫০টি ওষুধ শিল্প কারখানা এবং প্রায় ২৫ হাজার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিচালনা ব্যয় মারাত্মকভাবে বেড়ে যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য সেবাকে আরও দুর্বহ করে তুলছে।
এমন সংকটের মধ্যেও অবশ্য স্বস্তির বার্তা দিয়ে অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বিগত সরকারের কাছ থেকে পাওয়া উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সংকট এক রাতে মেটানো সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি জানান, পরিস্থিতি সামলাতে সরকার এলএনজি গ্রহণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি ভর্তুকি দাঁড়াতে পারে মোট জিডিপির ২.৮ শতাংশে (বা ২.৫ থেকে ৪.৮ বিলিয়ন ডলার), যা সামাল দিতে গিয়ে সামাজিক সুরক্ষা ও জরুরি সেবা খাতের বরাদ্দ ছাঁটাইয়ের চরম ঝুঁকি তৈরি হবে।
পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকা, কাজের সময়সূচি কমানো কিংবা কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনাগুলোর মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের উদ্বেগের বাস্তব প্রতিফলন ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।

